
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার এক চা বাগানের শ্রমিক কলোনিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা বৃষ্টি বুনার্জীর শৈশব কেটেছে অনটন আর সীমাবদ্ধতার ভেতর। সেই কলোনির ছোট ঘর থেকে শুরু হওয়া স্বপ্ন আজ পৌঁছেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ প্রান্তে। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগে ভর্তি হওয়া বৃষ্টি বর্তমানে চতুর্থ (চূড়ান্ত) বর্ষের শিক্ষার্থী। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একাগ্র সাধনার এ গল্প এখন তাঁর সম্প্রদায়ের অনেকের কাছেই প্রেরণার উৎস।
বৃষ্টির বাবা একজন অস্থায়ী চা শ্রমিক। মা গৃহিণী। দৈনিক মাত্র ১২০ টাকার মজুরিতে সংসার চালানো ছিল দুঃসাধ্য। নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সন্তানের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা অনেকের কাছেই বিলাসিতা। কিন্তু বৃষ্টির পরিবার সেই স্বপ্নটিকে আঁকড়ে ধরেছিল।
শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি গভীর মনোযোগ ছিল তাঁর। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বা আলাদা পড়ার পরিবেশ ছিল না। প্রাইভেট কোচিংয়ের সুযোগও পাননি কখনো। তবু আত্মবিশ্বাস আর কঠোর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সব পাবলিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলেছেন শিক্ষার ভিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় আর্থিক সংকট সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভর্তি ফি, আবাসন ও আনুষঙ্গিক খরচ জোগাতে পরিবারকে ঋণ নিতে হয়। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বৃষ্টি বলেন, অভাব ছিল, এখনো আছে। কিন্তু আমি সবসময় চেষ্টা করেছি পড়াশোনায় কোনো ঘাটতি না রাখতে। সমস্যাকে ভয় পেলে সামনে এগোনো যায় না। সেগুলো মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি টের পেয়েছেন দায়িত্বের ভার। পরিবারের স্বপ্ন, ঋণের চাপ, নিজের ভবিষ্যৎ সব মিলিয়ে পথটি সহজ ছিল না। তবু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। নিয়মিত ক্লাস, ল্যাব ও একাডেমিক প্রস্তুতির পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তুলছেন আত্মনির্ভর মানুষ হিসেবে।
তাঁর স্বপ্ন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৃষ্টি চান চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের শিক্ষাগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করতে। তাঁর বিশ্বাস, সুযোগ ও দিকনির্দেশনা পেলে চা শ্রমিকদের সন্তানরাও উচ্চশিক্ষায় সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের অনেকেরই মেধা আছে, কিন্তু সুযোগ নেই। যদি আমরা সুযোগ তৈরি করতে পারি, তাহলে পুরো সমাজটাই বদলে যেতে পারে।
নারীর অবস্থান নিয়েও তাঁর সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বৃষ্টি বলেন, “আজ নারীরা অনেক দূর এগিয়েছে, নানা ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবু অনেক জায়গায় এখনও প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আমি চাই প্রতিটি নারী তার ন্যায্য মর্যাদা পাক এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের অধিকারটুকু নিশ্চিত হোক।
বৃষ্টি বুনার্জীর পথচলা কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; এটি সংগ্রামী চা–শ্রমিক পরিবারগুলোর আশা ও সম্ভাবনার প্রতীক। সীমিত আয়, অনটন আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতার ভেতর থেকেও যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি মানুষকে এগিয়ে নিতে পারে বৃষ্টির জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।