
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও একাত্তরের সেই নির্মম স্মৃতি বয়ে বেড়ানো বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী আর নেই। যুদ্ধ তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল কৈশোর, স্বাভাবিক জীবন আর সামাজিক নিরাপত্তা। জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এবার তিনি বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকেও। তার মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামে।
বুধবার সকালে উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান টেপরী রাণী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে টেপরী রাণীর বয়স ছিল মাত্র ১৭। যুদ্ধের বিভীষিকায় তখন পুরো এলাকা আতঙ্কিত। পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে অসহায় বাবা মেয়েকে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে তুলে দিতে বাধ্য হন। সেই বিদায়ের মুহূর্তে ছিল না কোনো কথা, ছিল শুধু আতঙ্ক আর নীরব কান্না।
পরবর্তী সাত মাস পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হন তিনি। পরিবারের অন্য সদস্যদের রক্ষা করতে নিজের সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়েছিলেন টেপরী রাণী।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফেরেন তিনি। কিন্তু যুদ্ধশেষেও থামেনি তার সংগ্রাম। সমাজের নানা কটূক্তি ও অবজ্ঞার মুখে পড়তে হয় তাকে। অনাগত সন্তানকে নষ্ট করার জন্যও চাপ আসে চারদিক থেকে। তবে মেয়ের পাশে দাঁড়ান তার বাবা। সেই সন্তানই পরে হয়ে ওঠে তার জীবনের অবলম্বন।
পরে জন্ম নেয় ছেলে সুধীর বর্মন। কিন্তু সামাজিক অপমান তাদের পিছু ছাড়েনি। ছোটবেলা থেকে নানা বিদ্রূপ শুনে বড় হয়েছেন তিনি। বর্তমানে জীবিকা নির্বাহ করেন ভ্যানচালক হিসেবে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী। এরপর তার জীবনের আত্মত্যাগের গল্প সামনে এলে নতুন করে আলোচনায় আসে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের ইতিহাস।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “টেপরী রাণী শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত সাক্ষী। তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার পেছনে নারীদের ত্যাগ কত গভীর ছিল।”
ছেলে সুধীর বর্মন বলেন, “মাকে নিয়ে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু দেশের জন্য তার যে আত্মত্যাগ, সেটা কখনও ভোলার নয়।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম বলেন, “রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে বিদায় জানানো হয়েছে। জাতি তার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।”