
নিজস্ব প্রতিবেদন : সত্য সনাতন টিভি || অনলাইন সংস্করণ
জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি নেই। কিন্তু এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের শিক্ষার্থী কলি রানী এবার ডান পা দিয়ে লিখেই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। পরীক্ষাকক্ষে একটি ছোট বেঞ্চের ওপর খাতা রেখে পা দিয়ে উত্তর লিখতে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর এই দৃশ্য উপস্থিত শিক্ষক, পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মুগ্ধ করে এবং সবার কাছে অনুপ্রেরণার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে।
কলি রানীর বাড়ি কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গদাই গ্রামে। তিনি রুপালী রানীর মেয়ে এবং প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। জন্মগতভাবে দুই হাতের কবজি না থাকায় ছোটবেলা থেকেই ডান পা দিয়ে লেখা শেখেন। সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছেন।
এর আগে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় এ গ্রেড অর্জনের পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষাতেও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার মাধ্যমে দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার স্বপ্ন দেখেন কলি রানী।
শুধু পড়াশোনাই নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। গান গেয়ে ইতোমধ্যে তিনি একাধিক সম্মাননা ও স্মারক অর্জন করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহারেও তিনি সমান দক্ষ; ডান পা দিয়েই কম্পিউটার ও মুঠোফোন পরিচালনা করেন।
নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে কলি রানী বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি শরীরে নয়, বরং তার ইচ্ছাশক্তিতে। দৃঢ় সংকল্প থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।
তাঁর বড় ভাই মন্টু রাম রায় জানান, জন্ম থেকেই কলির হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় হাতে কলম ধরা সম্ভব হয়নি। তবে প্রবল আগ্রহ ও নিরলস চেষ্টার মাধ্যমে তিনি ডান পা দিয়ে লেখা রপ্ত করেন। এরপর থেকে নিজের মেধা ও পরিশ্রমের জোরে একের পর এক সাফল্য অর্জন করে চলেছেন।
কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য পরীক্ষার্থীর মতোই কলি রানী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় পরীক্ষার বিধি অনুযায়ী তাঁকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। তাঁর আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায় অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই কলি রানীর স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁর উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
কলি রানীর জীবনগাথা আবারও প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়দৃঢ় মনোবল, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসই মানুষের সাফল্যের প্রকৃত ভিত্তি। তাঁর সংগ্রাম ও অর্জন শুধু একজন শিক্ষার্থীর গল্প নয়; এটি অসংখ্য মানুষের জন্য সাহস, আশা এবং অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।