রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
হরিদাস চন্দ্রের মুক্তির দাবিতে ঐক্য পরিষদের সমাবেশ ও বিক্ষোভ রথযাত্রার আয়োজন শেষে বন্যার্তদের পাশে বাংলাদেশ হিন্দু ছাত্র মহাজোট বাঁশখালী উপজেলা শাখা বর্ণাঢ্য র‍্যালিতে চট্টগ্রামে রথযাত্রায় বাংলাদেশ হিন্দু ছাত্র মহাজোটের অংশগ্রহণ প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অনন্য কৃতিত্ব: ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেল বরগুনার যমজ তিন বোন রথযাত্রায় তৃষ্ণার্ত পুণ্যার্থীদের হাতে পানির বোতল তুলে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আরমান হোসেন রথযাত্রায় পরিবারের সদস্যরা, বাসায় একা ছিলেন গৃহবধূ; ঝালকাঠিতে মলিনা রায়ের মরদেহ উদ্ধার চট্টগ্রামে ইসকন প্রবর্তক মন্দিরের রথযাত্রার মহামিলন মেলায় শারদাঞ্জলি ফোরামের বর্ণাঢ্য অংশগ্রহণ শ্রীশ্রী রাসবিহারী ধামে দানবীর রাখাল দাশগুপ্তের পুণ্যস্মরণে ভাবগম্ভীর শোকসভা লাখো ভক্তের অংশগ্রহণে ঢাকায় মহাসমারোহে পালিত হলো শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব ২০২৬ কুমিল্লার কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে প্রথমবারের মতো বিলবোর্ডে শোভা পেল শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা মহারানীর বিগ্রহ

পাশ্চাত্যে শ্রীজগন্নাথ রথযাত্রার পথিকৃৎ জয়ানন্দ দাস: আত্মনিবেদন, ত্যাগ ও গুরুসেবার এক অমর ইতিহাস

  • প্রকাশিত: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদন : সত্য সনাতন টিভি : অনলাইন সংস্করণ

 

শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হলেও, এর পেছনে যাঁদের আত্মনিবেদিত সেবা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে, তাঁদের মধ্যে জয়ানন্দ দাস (Jayananda Dasa) অন্যতম। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর প্রারম্ভিক যুগের এই নিবেদিতপ্রাণ ভক্ত পাশ্চাত্যে শ্রীজগন্নাথ রথযাত্রা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর নিরলস শ্রম, আত্মত্যাগ ও গুরুসেবার ফলেই ভারতের বাইরে প্রথমবারের মতো শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।

 

সান ফ্রান্সিসকো ইসকন মন্দিরে শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলদেব ও শ্রীসুভদ্রার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার পর ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ পুরীধামের আদলে একটি রথযাত্রা আয়োজনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। গুরুদেবের সেই ইচ্ছাকেই নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান সেবাব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন জয়ানন্দ দাস।

 

তৎকালীন সময়ে ভারতের বাইরে কোথাও শ্রীজগন্নাথের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার কোনো নজির ছিল না। ফলে পূর্ব-অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা কিংবা প্রস্তুত কাঠামো—কিছুই ছিল না। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা জয়ানন্দ দাসকে নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। তিনি একটি সাধারণ ফ্ল্যাটবেড ট্রাককে ভিত্তি করে রথ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। ভক্তদের সহযোগিতা এবং নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি রথটি নির্মাণ সম্পন্ন করেন।

 

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৭ সালের ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো শহরে ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রীজগন্নাথ রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবই ছিল না; বরং বিশ্বব্যাপী রথযাত্রা আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

তবে জয়ানন্দ দাসের অবদান কেবল প্রথম রথযাত্রা আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতি বছর উৎসবকে আরও সুশৃঙ্খল, বৃহৎ ও সফল করে তুলতে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন। রথ নির্মাণ, অর্থ সংগ্রহ, সরকারি অনুমতি গ্রহণ, প্রচার-প্রচারণা, স্বেচ্ছাসেবক সমন্বয় এবং উৎসবের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিতেন।

 

রথ নির্মাণের সময় তিনি প্রায় রথের কাছেই অবস্থান করতেন এবং উৎসব ঘনিয়ে এলে দিনের পর দিন অল্প কিংবা প্রায় বিনা ঘুমেই কাজ চালিয়ে যেতেন। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের চেয়ে গুরুসেবা ও ভগবানের সেবাই ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

 

জয়ানন্দ দাস ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠকও। শহরের পুলিশ প্রশাসন, পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে তিনি অনেক সময় নিজ হাতে পাই (Pie) প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আপ্যায়ন করতেন। তাঁর এই আন্তরিকতা রথযাত্রার প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমকে অনেক সহজ করে তুলেছিল।

 

তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেট পার্কে আয়োজিত রথযাত্রা বছর বছর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। হাজার হাজার মানুষ এই উৎসবে অংশ নিতে শুরু করেন এবং প্রথমবারের মতো শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলদেব ও শ্রীসুভদ্রার দর্শন লাভের সুযোগ পান। পরবর্তীকালে এই রথযাত্রা বিশ্বব্যাপী ইসকনের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কর্মসূচিতে পরিণত হয়।

 

১৯৭৬ সালে তাঁর শরীরে ক্যান্সারের লক্ষণ ধরা পড়লেও তিনি নিজের অসুস্থতার চেয়ে রথযাত্রার সাফল্যকেই বেশি গুরুত্ব দেন। জানা যায়, নিউইয়র্ক রথযাত্রা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর অসুস্থতার বিষয়টি যেন শ্রীল প্রভুপাদকে জানানো না হয়—এমন অনুরোধও তিনি এক গুরুভাইকে করেছিলেন। এতে তাঁর গুরুসেবার প্রতি গভীর নিষ্ঠা ও আত্মনিবেদন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

 

পরবর্তীকালে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়লেও তিনি সেবাকাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। জীবনের শেষ মাসগুলোতেও লস অ্যাঞ্জেলেস রথযাত্রার জন্য অর্থ সংগ্রহ, টেলিফোনে সমন্বয় এবং ভক্তদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। একদিন ভেনিস বিচে, যেখানে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, চারদিকে তাকিয়ে গভীর আনন্দে তিনি বলেছিলেন, “What a wonderful Rathayatra!”

 

১৯৭৭ সালে জয়ানন্দ দাস এই নশ্বর জগৎ ত্যাগ করেন। তাঁর তিরোধানে শ্রীল প্রভুপাদ গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, তিনি জীবনভর যেমন শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিবেদিত ছিলেন, তেমনি মৃত্যুকালেও সেই সেবাভাবেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর তিরোভাব দিবস বৈষ্ণব মহাপুরুষদের ন্যায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের নির্দেশ প্রদান করেন।

 

জয়ানন্দ দাসের অনন্য সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ শ্রীল প্রভুপাদ আরও নির্দেশ দেন যে, ভবিষ্যতের প্রত্যেক শ্রীজগন্নাথ রথযাত্রায় একটি রথে জয়ানন্দ দাসের ছবি বহন করা হবে। এই নির্দেশ তাঁর অবদানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং রথযাত্রা আন্দোলনে তাঁর স্থায়ী স্থানকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

 

আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে শ্রীজগন্নাথ রথযাত্রা লক্ষ লক্ষ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, তার ভিত্তি রচনায় জয়ানন্দ দাসের আত্মনিবেদিত সেবার অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর জীবন ভক্তসমাজকে শিক্ষা দেয় প্রকৃত ভক্তি কেবল কথায় নয়, বরং নিঃস্বার্থ সেবা, বিনয়, ত্যাগ এবং গুরু-আজ্ঞা পালনের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়। তাই জয়ানন্দ দাস কেবল ইতিহাসের একটি নাম নন; তিনি ভক্তি, সেবা ও আত্মনিবেদনের এক অনন্ত প্রেরণার উৎস

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews