
নিজস্ব প্রতিবেদন : জয় দাশ | চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের রাউজানে গুজরা শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিমাংশু দত্তের ২৬ বছরের কর্মজীবনের অবসান হয়েছে। অবসর উপলক্ষে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে তাঁকে দেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী ও সম্মানজনক বিদায় সংবর্ধনা।
গত ৩১ আগস্ট বিদ্যালয়ের হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হিমাংশু দত্তকে অবসরকালীন বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ২০০০ সালে পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের বাসিন্দা হিমাংশু দত্ত গুজরা শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ায় তিনি নিয়ম অনুযায়ী অবসরে যান।
বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কমিটির সদস্য সচিব কনক দাশ গুপ্ত। প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক শেখ মোহাম্মদ আলাউদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাউজান প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নেজাম উদ্দিন রানা ও প্রবাসী মোহাম্মদ হারুন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিপ্লব কুমার ধর, সিনিয়র শিক্ষক শম্ভুনাথ পারিয়াল, বাপ্পী দাশ, শিক্ষক প্রতিনিধি সদস্য মোহাম্মদ গোলাম ফারুক, প্রভাস কুমার ধর, লাবনী প্রভা দত্ত, পিংকী শীল, সহকারী শিক্ষক সুমন বড়ুয়া, সুমন কান্তি দাশ, আশিষ দাশ, দীপিতা দেব ও মোস্তেকা খাতুন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহেলা কাশেম আর্থী ও সৌম্য আকতারের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন আলিফা খানম। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা দীপিতা দেব ও তাঁর দল এবং শিক্ষার্থী মুন দে সংগীত পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠানে হিমাংশু দত্তকে ফুলের মালা পরিয়ে ক্রেস্ট ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৬ বছরের কর্মজীবনে এই প্রথমবারের মতো তিনি অতিথির আসনে বসেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের উপস্থিতিতে তাঁকে ঘিরেই সাজানো হয় পুরো বিদায় আয়োজন।
বিদায়ের আবেগঘন মুহূর্তে বক্তব্য দিতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বিদ্যালয়ের প্রতি হিমাংশু দত্তের দায়িত্বশীলতা, আন্তরিকতা ও সহজ-সরল আচরণের বিষয়টি বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে।
বিদায় অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজানোর সময়। প্রতিদিনের মতো শেষ কর্মদিবসেও তিনি বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজান। তবে এদিনের ঘণ্টাধ্বনি ছিল তাঁর ২৬ বছরের কর্মজীবনের শেষ ঘণ্টাধ্বনি।
ঘণ্টা বাজানোর পর বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা তাঁকে বিদ্যালয়ের ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দেন। সেখানে বিদ্যালয়ের সভাপতির পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে সাজানো একটি গাড়ি রাখা হয়। ওই গাড়িতে করে তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
গাড়িতে ওঠার আগে দীর্ঘদিনের কর্মস্থলের দিকে শেষবারের মতো তাকান হিমাংশু দত্ত। ২৬ বছরের কর্মজীবনে বিদ্যালয়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও স্মৃতির আবেগে গাড়ি বিদ্যালয় চত্বর ছাড়ার সময় তাঁর চোখে পানি চলে আসে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন আয়োজনকে স্থানীয়রা একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনকারী প্রত্যেক মানুষের শ্রম ও অবদান সম্মানের দাবিদার। হিমাংশু দত্তের বিদায় আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই মূল্যবোধেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
দীর্ঘ ২৬ বছরের কর্মজীবন শেষে হিমাংশু দত্ত অবসরে গেলেও গুজরা শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও সম্পর্ক শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্টদের মাঝে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।