সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
রংপুরে চারজনকে হত্যা: তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, বিচার দাবিতে উত্তাল রাজপথ বাংলাদেশ হিন্দু ছাত্র মহাজোট চট্টগ্রাম জেলা শাখার নতুন কমিটি অনুমোদন একটি পরিবারের স্বপ্নের নির্মম পরিসমাপ্তি: রংপুরে একই পরিবারের চারজন নিহত রাউজানে মন্দির থেকে স্বর্ণ-রৌপ্য চুরি, মুসলিম তরুণ গ্রেপ্তার রংপুরে চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনায় দুইজন আটক রংপুরে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় হিন্দু পরিবারের তিন সদস্যকে কুপিয়ে গুরুতর আহত রংপুরের, মাহিগঞ্জে গোবিন্দ মন্দিরে গীতা স্কুলের উদ্বোধন, শিশু-কিশোরদের হাতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মহানগর পূজা কমিটির নতুন নেতৃত্বকে ঢাকেশ্বরী মাতৃসেবা সংঘের শুভেচ্ছা রাঙ্গুনিয়ায় ‘চন্দ্রলোক’ ভাবনায় গণেশ চতুর্থীর আয়োজন, প্রতিমা গড়ছেন তমল পাল

রংপুরে চারজনকে হত্যা: তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, বিচার দাবিতে উত্তাল রাজপথ

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক : অনলাইন সংস্করণ : সত্য সনাতন টিভি 

 

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে রংপুর। হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত এবং দ্রুত বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন জিলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নাগরিক সমাজ ও নিহতদের স্বজনরা।

 

পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও গ্রেপ্তার হওয়া দুই যুবককে ঘিরে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আরও গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যাকে তাঁরা ‘অবিশ্বাস্য’ আখ্যা দিয়ে ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

 

পুলিশের বক্তব্য ঘিরে নানা প্রশ্ন

 

রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, মাদক সেবনের ঘটনা দেখে ফেলায় গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া দুই যুবক গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ইয়াবা সেবন করতে গেলে তিনি তাঁদের বাধা দেন। এ নিয়ে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয় এবং পরে পরিবারের আরও তিন সদস্যকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।

 

তবে পুলিশের এই বক্তব্য নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, চারজন মানুষকে হত্যা করার মতো একটি ভয়াবহ ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু দুই যুবকের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়, হত্যার ধরন, সম্ভাব্য পূর্বপরিকল্পনা এবং আশপাশের মানুষের বক্তব্য সবকিছু সমন্বিতভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

 

রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী নূর বলেন, হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুইজনকে ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পুলিশের বক্তব্য সামনে আসায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানান তিনি।

 

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সফিয়ার রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনায় কোনো ধরনের দায়সারা তদন্ত মেনে নেওয়া হবে না। তাঁর দাবি, প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

 

সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুল নবী ডলারও তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, বাড়ির সিসিটিভি ও বৈদ্যুতিক তার কেটে দেওয়া, একই পরিবারের চারজনকে হত্যা এবং আশপাশের মানুষজনের বিষয়টি টের না পাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গভীরভাবে তদন্ত করা দরকার।

 

বিচার দাবিতে সড়কে শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজ

 

হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে সোমবার (২৪ আগস্ট) রংপুর নগরীর কাছারীবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন জিলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।

 

এর আগে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধন ও শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে কাছারীবাজার এলাকায় গিয়ে অবস্থান নেয়। কর্মসূচিতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং মহানগর নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দও সংহতি জানান।

 

একই দিন বিকেলে রংপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে মহানগর নাগরিক কমিটি। সেখানে বক্তারা বলেন, চারজন মানুষের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

 

আন্দোলনকারীরা তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত অগ্রগতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

 

একই সঙ্গে চার স্বজনের শেষকৃত্য

 

হত্যাকাণ্ডের পর রোববার (২৩ আগস্ট) রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহতদের ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

 

পরে চারজনের মরদেহ নগরীর দখীগঞ্জ মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশে একই সময়ে চারটি চিতায় তাঁদের দাহকার্য সম্পন্ন করা হয়। প্রিয়জনদের হারানোর শোকে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো শ্মশান এলাকা। এক পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক পরিণতি উপস্থিত মানুষের মধ্যেও গভীর শোকের সৃষ্টি করে।

 

ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধের প্রাথমিক তথ্য

 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, প্রাথমিক ময়নাতদন্তে নিহত চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে।

 

মরদেহের মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, পচন ধরার কারণেই এমন পরিবর্তন হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে। মরদেহে অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

 

তবে চূড়ান্ত মতামতের জন্য সংগৃহীত নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ফলে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

 

দুই আসামির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি

 

কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া দুই যুবক,মুক্ত দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) রোববার রাতে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক এসএম রফিকুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি গ্রহণের পর তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

 

এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

সামনে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা

 

এদিকে মঙ্গলবার জিলা স্কুলে নিহতদের স্মরণে প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন আন্দোলনকারীরা।

 

নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে এখন মূল দাবি একটাই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার। পুলিশের তদন্ত নিয়ে ওঠা প্রশ্নের যথাযথ উত্তর এবং চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে এখন তাকিয়ে রংপুরবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews