মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
রংপুরে চারজনকে হত্যা: তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, বিচার দাবিতে উত্তাল রাজপথ বাংলাদেশ হিন্দু ছাত্র মহাজোট চট্টগ্রাম জেলা শাখার নতুন কমিটি অনুমোদন একটি পরিবারের স্বপ্নের নির্মম পরিসমাপ্তি: রংপুরে একই পরিবারের চারজন নিহত রাউজানে মন্দির থেকে স্বর্ণ-রৌপ্য চুরি, মুসলিম তরুণ গ্রেপ্তার রংপুরে চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনায় দুইজন আটক রংপুরে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় হিন্দু পরিবারের তিন সদস্যকে কুপিয়ে গুরুতর আহত রংপুরের, মাহিগঞ্জে গোবিন্দ মন্দিরে গীতা স্কুলের উদ্বোধন, শিশু-কিশোরদের হাতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মহানগর পূজা কমিটির নতুন নেতৃত্বকে ঢাকেশ্বরী মাতৃসেবা সংঘের শুভেচ্ছা রাঙ্গুনিয়ায় ‘চন্দ্রলোক’ ভাবনায় গণেশ চতুর্থীর আয়োজন, প্রতিমা গড়ছেন তমল পাল

একটি পরিবারের স্বপ্নের নির্মম পরিসমাপ্তি: রংপুরে একই পরিবারের চারজন নিহত

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

কলমে: সুজিত ঘোষ,লেখক, কলামিস্ট, কবি ও সংগঠক

 

রংপুর প্রতিনিধি: একটি বাড়িকে ঘিরে মানুষের কত স্বপ্ন থাকে নিরাপদ আশ্রয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, অবসরজীবনের প্রশান্তি আর আপনজনদের নিয়ে শান্তিতে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার একটি পরিবারও এমন স্বপ্ন নিয়েই নিজেদের ভবন নির্মাণ করছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের বাড়িই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল এক পরিবারের চার সদস্যের নির্মম মৃত্যুর সাক্ষী।

 

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং স্কুলপড়ুয়া ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর একসঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনায় রংপুরজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। গত শনিবার রাতে তাঁদের মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের মধ্যে নেমে আসে গভীর শোক ও আতঙ্ক।

 

গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন একজন শিক্ষক। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসর নিয়েও তিনি মানুষের সেবায় যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। নিজেদের একটি ভবন নির্মাণের কাজও চলছিল প্রায় তিন বছর ধরে। স্বাভাবিক একটি পরিবারের মতোই তাঁদের জীবন এগিয়ে যাচ্ছিল ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা, সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন এবং অবসরজীবনকে ঘিরে নানা প্রত্যাশা।

 

প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারটি ছিল শান্তিপ্রিয় এবং আশপাশের মানুষের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও ছিল ভালো। বাইরে থেকে দেখলে তাঁদের জীবনযাত্রায় অস্বাভাবিকতার কোনো চিহ্ন ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই পরিবারকে ঘিরে নেমে আসে এক ভয়াবহ অন্ধকার।

 

পুলিশের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে দুই তরুণ ইয়াবা সেবন করছিলেন। বিষয়টি টের পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে গিয়ে তাঁদের বাধা দেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর তাঁকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।

 

গণপতির চিৎকার শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ঘরে থাকা ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকেও হত্যা করা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছে শিশু আয়ুশের মৃত্যুর ঘটনা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবীজুড়ে থাকার কথা বাবা-মায়ের ভালোবাসা, বোনের স্নেহ, স্কুলের বন্ধু আর ভবিষ্যতের নানা স্বপ্ন সেই বয়সেই তাকে হারাতে হলো জীবন।

 

একটি পরিবারের চার সদস্যকে হারানোর এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়; এটি একসঙ্গে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কীভাবে একটি পরিবারের বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটল? কেন তাঁদের জীবন কেড়ে নেওয়া হলো? ঘটনার পেছনে আসল কারণ কী? আর অপরাধের সঙ্গে কারা জড়িত এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।

 

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ডাকাতির মতো দেখানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। বাড়ির আলমারি ও ড্রয়ার খোলা, বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা এবং মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখার মতো আলামত তদন্তে পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

 

ঘটনার সূত্র ধরে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুই তরুণকে আটক করা হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তাঁদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সমীচীন নয়। তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের ভূমিকা ও ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করাই এখন মূল বিষয়।

 

পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। বাড়ির গেটে তালা দেখে স্বজনেরা খোঁজ নিতে গিয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানান। পরে বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যে বাড়িতে একসময় পরিবারের সদস্যদের হাসি-কথায় মুখর থাকার কথা ছিল, সেখানেই একসঙ্গে মিলল চারটি নিথর দেহ।

 

প্রথমদিকে ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে সন্দেহ করেছিল পুলিশ। পরে তদন্তের অগ্রগতিতে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আসে। তদন্তের এই ভিন্ন ভিন্ন দিকই প্রমাণ করে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি আলামত ও তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

 

এই হত্যাকাণ্ড একই সঙ্গে সমাজে মাদকের বিস্তার ও জননিরাপত্তার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকে বিপথে নেয় না; কখনো কখনো তার প্রভাব একটি পরিবার, একটি সমাজ এমনকি বহু মানুষের জীবনেও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকেই সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

 

একই সঙ্গে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পর জনমনে যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি পরিবারের চারজন মানুষ একই ঘটনায় প্রাণ হারানোর ঘটনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর। তাই তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ না রেখে দ্রুততম সময়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা জরুরি।

 

নিহত পরিবারের স্বজনদের জন্য এই ক্ষতি কোনো ভাষায় পূরণ করার নয়। একজন বাবা হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের, একজন মা হারিয়েছেন তাঁর স্বামী ও দুই সন্তানকে আর স্বজনেরা হারিয়েছেন আপনজনদের। একটি পরিবারের যে ঘরে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন পড়ে আছে শুধু স্মৃতি আর অসমাপ্ত স্বপ্ন।

 

এই ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা, মুঠোফোনের তথ্যসহ তদন্তের প্রতিটি বৈজ্ঞানিক উপাদান যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

 

রংপুরের মাছুয়াপাড়ার সেই বাড়িটি হয়তো আর কখনো আগের মতো হবে না। সেখানে আর শোনা যাবে না গণপতি চক্রবর্তীর কণ্ঠ, প্রীতিলতার সংসারজুড়ে থাকবে না ব্যস্ততা, আগামীকে ঘিরে কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকবে না, আর স্কুলপড়ুয়া আয়ুশও কোনোদিন বই হাতে বাড়ি ফিরবে না।

 

থেকে যাবে কিছু বই, কিছু পোশাক, কিছু ব্যবহার্য জিনিস, অসংখ্য স্মৃতি আর পূরণ না হওয়া স্বপ্ন।

 

আর থেকে যাবে একটি প্রশ্ন একটি শান্ত পরিবারের চারটি জীবন কেন এভাবে থেমে গেল?

 

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নিহত পরিবারের স্বজনদের নয়, পুরো সমাজের জানার অধিকার রয়েছে। প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই চারটি প্রাণের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায় কিছুটা হলেও পূরণ হতে পারে।

 

চারটি প্রাণ যেন বিচারহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে না যায় এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews