
কলমে: সুজিত ঘোষ,লেখক, কলামিস্ট, কবি ও সংগঠক
প্রেম মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও মানবিক অনুভূতি। ভালোবাসা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে। কিন্তু সেই ভালোবাসার সম্পর্ক যদি প্রতারণা, মিথ্যা পরিচয়, ব্ল্যাকমেইল, ভয়ভীতি, জবরদস্তি, অপহরণ কিংবা ধর্মান্তরের জন্য চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সেটিকে আর নিছক ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। তখন বিষয়টি পরিণত হয় ব্যক্তি-নিরাপত্তা, সামাজিক মূল্যবোধ, আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে।
‘লাভ জিহাদ’ শব্দটি নিয়ে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও বিতর্ক চলে আসছে। শব্দটির ব্যবহার, এর সংজ্ঞা কিংবা এর পেছনে থাকা অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ভিন্নমত রয়েছে। তবে বিতর্কের বাইরে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদি প্রতারণা, জবরদস্তি, ভয়ভীতি, ব্ল্যাকমেইল, অপহরণ কিংবা কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মান্তরের চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনগত প্রতিকার অবশ্যই প্রয়োজন।
বিশেষ করে সনাতনী সমাজে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং আন্তঃধর্মীয় বিবাহকে ঘিরে অনেক পরিবারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই উদ্বেগকে একেবারে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হলেই সেটিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করাও ন্যায়সংগত নয়। সমস্যার সমাধান করতে হলে আবেগের পরিবর্তে তথ্য, প্রমাণ, সচেতনতা এবং আইনের শাসনের ওপর নির্ভর করতে হবে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণ-তরুণীদের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচয়ের মাধ্যমে অনেক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব সম্পর্ক স্বাভাবিক ও ব্যক্তিগত। কিন্তু সুযোগসন্ধানী কেউ যদি ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে, নিজের বৈবাহিক অবস্থা গোপন করে, মিথ্যা পেশাগত পরিচয় দেয় কিংবা আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে, তাহলে সেখান থেকেই প্রতারণার সূত্রপাত হতে পারে।
এ কারণে প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত পরিবার। সন্তানকে শুধু শাসন বা নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সন্তান যেন কোনো সম্পর্ক, মানসিক চাপ, সন্দেহ বা বিপদের কথা ভয় ছাড়াই বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের কাছে বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। অনেক সময় পরিবারে অতিরিক্ত কঠোরতা বা বিচারভীতির কারণে সন্তান সমস্যার কথা গোপন করে। আর সেই সুযোগেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তরুণ প্রজন্মকেও নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হতে হবে। অনলাইনে পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় যাচাই না করে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা উচিত নয়। ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজে কারও হাতে তুলে দেওয়া ঠিক নয়। কোনো সম্পর্ক বিয়ের দিকে এগোলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, পারিবারিক অবস্থা এবং বৈবাহিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। কেউ হুমকি দিলে, ব্ল্যাকমেইল করলে কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখালে চুপ করে না থেকে দ্রুত পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া উচিত।
সনাতনী সমাজের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা। নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সম্পর্কে একটি প্রজন্ম যত বেশি সচেতন হবে, তত বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মন্দির এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিকতা, আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
তবে ধর্মীয় সচেতনতার অর্থ কখনোই অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করা নয়। নিজের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে ভালোভাবে জানার পাশাপাশি অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত অধিকারের প্রতিও সম্মান দেখানো প্রয়োজন। কারণ একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তদন্ত ও বিচার হতে হবে অপরাধের ভিত্তিতে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ স্বেচ্ছায় সম্পর্ক বা বিবাহের সিদ্ধান্ত নিলে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আবার কোনো সম্পর্কের আড়ালে মিথ্যা পরিচয়, প্রতারণা, ভয়ভীতি, ব্ল্যাকমেইল, অপহরণ কিংবা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ উঠলে সেটিও উপেক্ষা করা উচিত নয়।
তদন্তকারীদের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—পরিচয় কি মিথ্যা ছিল? প্রতারণা করা হয়েছে কি? কোনো ধরনের জোর বা হুমকি ছিল কি? ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে কি? অপহরণ বা আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছে কি? ধর্মান্তরের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে কি? এসব অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে?
অর্থাৎ অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু হবে অপরাধের প্রকৃতি ও প্রমাণ; কোনো সম্প্রদায় নয়।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় সমস্যা হলো গুজব। কোনো একটি ঘটনা সামনে আসার পর প্রকৃত ঘটনা যাচাই না করেই নানা ধরনের পোস্ট, ভিডিও ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃত ভুক্তভোগী আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন, আবার নিরপরাধ ব্যক্তিও সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন।
সনাতনী সমাজের সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর এখানে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ সামনে এলে প্রথমেই তার সত্যতা যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন হলে আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহায়তা নিতে হবে। আবেগতাড়িত বক্তব্য কিংবা যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সত্য উদঘাটন এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
নারী ও তরুণীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, আইনি পরামর্শ ও ডিজিটাল নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কীভাবে অনলাইন প্রতারণা শনাক্ত করতে হবে, কীভাবে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে, কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং বিপদের সময় কীভাবে দ্রুত সহায়তা নিতে হবে এসব বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান তরুণ প্রজন্মকে দেওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও এখানে কম নয়। কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ফোনকল, বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেনসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে নিরপরাধ ব্যক্তিকেও সামাজিক ও আইনি হয়রানি থেকে রক্ষা করতে হবে। কারণ আইনের শাসনের মূল কথা হলো,কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কাউকে শুধু পরিচয়ের কারণে অপরাধীও বানানো যাবে না।
সনাতনী সমাজের বিভিন্ন সংগঠন চাইলে এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ নিতে পারে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদের ডিজিটাল নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত অধিকার ও আইনি সচেতনতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। পরিবারগুলোর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, নারীদের আইনি সহায়তার পথ সহজ করা এবং গুজবের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শুধু প্রতিবাদ, মিছিল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক কাঠামো, যেখানে তরুণরা সচেতন থাকবে, পরিবার তাদের পাশে থাকবে, সামাজিক সংগঠনগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং রাষ্ট্র আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ‘লাভ জিহাদ’ নামের বিতর্কে আটকে রাখলে চলবে না। দেখতে হবে কোনো অপরাধ ঘটেছে কি না। প্রেমের নামে প্রতারণা, জবরদস্তি, ব্ল্যাকমেইল, অপহরণ কিংবা ধর্মান্তরের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হলে যে-ই করুক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বেচ্ছায় নেওয়া ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এক করে দেখাও উচিত নয়।
সনাতনী সমাজকে নিরাপদ রাখতে হলে তরুণ প্রজন্মকে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, শিক্ষা, মূল্যবোধ, আত্মমর্যাদা, প্রযুক্তিগত সচেতনতা এবং আইনি জ্ঞান দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সম্মান করতে হবে।
আমাদের অবস্থান তাই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন আবেগ নয়, চাই প্রমাণ; ঘৃণা নয়, চাই সচেতনতা; গুজব নয়, চাই তথ্য; নিজ হাতে বিচার নয়, চাই আইনের শাসন। শুধু প্রতিবাদ নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধ।
কারণ সমাজকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করা নয়; বরং তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলা, যাতে তারা প্রতারণা, জবরদস্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেরাই দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে।
অপরাধী যে ধর্মেরই হোক, অপরাধের বিচার হতে হবে। আর নিরপরাধ যে ধর্মেরই হোক, তার অধিকার ও মর্যাদাও রক্ষা করতে হবে।