
সম্প্রতি যোগাযোগমাধ্যমে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় অবস্থিত আদিনাথ মন্দির সংলগ্ন কিছু পাহাড়কে মিনি কাশ্মীর বা নীল পাহাড় হিসেবে প্রচার করে সেখানে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি এবং জনমত তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রচারিত এসব পাহাড় কোনো স্বীকৃত পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং এগুলো দেবোত্তর সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি ও ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাহাড়গুলো প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন স্থানে গভীর খাদ ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে সেখানে মানুষের চলাচল নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানে পাহাড়ের কিছু অংশ আদিনাথ মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্ধারিত খাজনার ভিত্তিতে স্থানীয় ব্যক্তিরা ব্যবহার করছেন গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ঘাস ও শন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় সবুজ আচ্ছাদনে মনোরম রূপ ধারণ করলেও বছরের অধিকাংশ সময় সেই দৃশ্য থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও দেখে অনেক দর্শনার্থী সেখানে ভিড় করছেন, দৌড়াদৌড়ি, ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করছেন। এতে একদিকে লিজগ্রহীতাদের উৎপাদিত ঘাস ও শন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
দেবোত্তর সম্পত্তির আইনি অবস্থান:
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, জমিদার শরৎচন্দ্র রায় চৌধুরী ১৮৭৬ সালে তাঁর জমিদারির সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবে উৎসর্গ করেন। দেবোত্তর সম্পত্তি কোনো ব্যক্তি বা উত্তরাধিকারীর ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পত্তি নয়, বরং ধর্মীয় উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে উৎসর্গকৃত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত।
আইনজ্ঞদের মতে, দেবোত্তর সম্পত্তি উৎসর্গকারীর নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করা যায় না। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ ধরনের সম্পত্তির মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক বা বিনোদনমূলক কাজে ব্যবহার করা আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
এ কারণে পাহাড়গুলোতে সাধারণ পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট, বিনোদন পার্ক বা অনুরূপ বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণের দাবি দেবোত্তর সম্পত্তির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।
উন্নয়নের সুযোগ থাকলেও থাকতে হবে সীমার মধ্যে:
তবে মন্দির সংশ্লিষ্ট প্রবীণরা বলছেন, ধর্মীয় পরিবেশ ও সম্পত্তির চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তীর্থযাত্রীদের সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যাত্রীনিবাস, নিরাপদ সিঁড়ি বা চলাচলের ব্যবস্থা, বিশ্রামাগার এবং ধর্মীয় স্থাপনা-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ করা যেতে পারে।
এদিকে মন্দির-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেবোত্তর সম্পত্তির নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনে মন্দির কর্তৃপক্ষ তাদের নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যমান লিজ পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগনির্ভর প্রচারণা বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর পরিবর্তে বিষয়টি ইতিহাস, আইন এবং সম্পত্তির প্রকৃত অবস্থান বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে দেবোত্তর সম্পত্তির ধর্মীয় মর্যাদা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।