
নিজস্ব প্রতিবেদক : সত্য সনাতন টিভি | অনলাইন সংস্করণ
২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার ও হত্যার হুমকির অভিযোগ করেছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রবীর চন্দ্র পাল। তাঁর দাবি, ওই সময় সিলেটে অবস্থান করায় তাঁকে লক্ষ্য করে অনলাইনে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয় এবং পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে জীবন বাঁচাতে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়।
ফেইসবুকে দীর্ঘ এক বক্তব্যে নিজের সেই সময়ের অভিজ্ঞতা, পরবর্তী সময়ে ভারতে অবস্থান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে নানা সমালোচনা এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রবীর চন্দ্র পাল।
প্রবীর চন্দ্র পাল বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি সিলেটের একটি চা-বাগানে চা শ্রমিক পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণসংক্রান্ত একটি প্রকল্পের জরিপের কাজে ছিলেন। সেদিন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের আদালতে নেওয়ার খবর তিনি সিলেট থেকে অনুসরণ করছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করছিলেন।
তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন ফেসবুক আইডি, পেজ ও গ্রুপে গুজব ছড়িয়ে পড়তে দেখে তিনি দ্রুত নির্ভুল তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের লাঠিচার্জ ও বিশৃঙ্খলার খবর পান। পরে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
প্রবীরের দাবি, এরপর তাঁর একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম ও আদালতের দায়রা জজ সাইফুল ইসলামের নাম নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হতে থাকে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে পুরস্কার ঘোষণার কথাও বিভিন্ন পোস্টে ছড়ানো হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে কয়েকজন তাঁকে দ্রুত সিলেট ছাড়ার পরামর্শ দেন। একই সময়ে কয়েকটি গণমাধ্যম ও রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশে তাঁকে ঘিরে ছড়ানো তথ্যকে গুজব বা মিথ্যা তথ্য হিসেবে তুলে ধরেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রবীর চন্দ্র পাল বলেন, ওই সময় তাঁর সামনে দুটি পথ ছিল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে থাকা অথবা পরিবার, ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া। শিক্ষাগুরু ও ঘনিষ্ঠজনদের পরামর্শে তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে প্রথমবারের মতো ভারতে যান বলে জানান তিনি।
তাঁর দাবি, দেশ ছাড়ার পরদিন সিলেটের একটি মন্দিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। তবে এ দাবির বিষয়ে তিনি কোনো সরকারি নথি বা তদন্তের তথ্য উপস্থাপন করেননি।
‘আন্দোলন করে কোনো টাকা নিইনি :
বক্তব্যে নিজের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নামে অর্থ নেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রবীর চন্দ্র পাল।
তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য কারও কাছ থেকে তিনি কোনো টাকা নেননি এবং আন্দোলনের সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনেও তিনি যুক্ত ছিলেন না। তাঁর দাবি, হিন্দুদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যেই তিনি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
প্রবীর আরও বলেন, আন্দোলনের সময় তাঁর ফেসবুক পেজে বিধিনিষেধ ছিল এবং তখন পেজটি থেকে আয়ও হতো না। ফলে আন্দোলনের ভিডিও প্রকাশ করে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
‘নিজে বক্তৃতা দিইনি, অন্যদের বক্তব্য ধারণ করেছি’:
নিজেকে প্রচারের আলোয় আনার জন্য আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগও নাকচ করেছেন প্রবীর।
তিনি বলেন, আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি মঞ্চে উঠে বক্তৃতা না দিয়ে বরং অন্যদের বক্তব্য ও কর্মসূচির ভিডিও ধারণ করেছেন। তাঁর দাবি, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আন্দোলনকেন্দ্রিক অনেক বক্তব্যের ভিডিও তিনি ধারণ করেছেন এবং সেগুলো অনলাইনে প্রকাশ করেছেন।
প্রবীরের ভাষায়, নিজের বক্তব্য প্রচারের চেয়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের বক্তব্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়াকেই তিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন।
দেশ ছাড়ার পরও সমালোচনা :
বক্তব্যে তিনি জানান, দেশ ছাড়ার পর প্রায় পাঁচ-ছয় মাস বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হলেও মূলত ধর্মীয় ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন মানুষের অনুরোধে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিষয়েও মাঝে মাঝে পোস্ট করা শুরু করেন। তখন তাঁর পোস্টের মন্তব্যে কেউ কেউ তাঁকে আন্দোলনের নামে অর্থ নেওয়া, দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আরাম-আয়েশে থাকা এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ‘ফাঁসানোর’ মতো বিভিন্ন অভিযোগ করেন বলে জানান তিনি।
এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে প্রবীর বলেন, আন্দোলনের নামে অর্থ নেওয়া বা অন্যের টাকা আত্মসাতের কোনো প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করা হোক।
‘নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দেশে ফিরতে বলা কেন?’
দেশে ফিরে রাজপথের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বানের জবাবও দিয়েছেন প্রবীর চন্দ্র পাল।
তিনি প্রশ্ন করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে কে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা না থাকলে তাঁকে দেশে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে কেন এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, দেশে থাকলে হয়তো তাঁকে নিয়ে অন্য ধরনের প্রশ্ন উঠত, আর বিদেশে অবস্থান করেও তিনি সমালোচনার মুখে পড়ছেন।
দীর্ঘ বক্তব্যের শেষ দিকে প্রবীর চন্দ্র পাল জানান, ভবিষ্যতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বা আন্দোলনসংক্রান্ত বিষয়ে আর নিয়মিত লেখালেখি করতে চান না।
তিনি বলেন, অনলাইনের বাইরে থেকে সম্ভব হলে তিনি কাজ করবেন এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির জন্য প্রার্থনা ও নিজের সাধ্যের মধ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। একই সঙ্গে তাঁকে আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করে কোনো দায়িত্ব বা আবদার না করার অনুরোধ জানান তিনি।
নিজের পূর্বের ভুলের জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন প্রবীর। তাঁর ভাষ্য, অজ্ঞাতে বা জ্ঞাতসারে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
সবশেষে তিনি সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, মতপার্থক্য থাকলেও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের দ্রুত মুক্তি, সনাতনীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সবার শান্তির জন্য প্রার্থনা করে বক্তব্য শেষ করেন প্রবীর চন্দ্র পাল।