
নিজস্ব প্রতিবেদক : জয় দাশ | চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি আর বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে উদযাপিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। নগরজুড়ে ৩০টির বেশি রথের শোভাযাত্রা, হাজারো ভক্তের অংশগ্রহণ এবং শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও কীর্তনের সুরে বৃহস্পতিবার বন্দরনগরী উৎসবের আবহে মুখর হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় রথযাত্রা বের হয় নগরের প্রবর্তক মোড়ে অবস্থিত ইসকন মন্দির থেকে। দুপুর আড়াইটার দিকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রায় নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ কয়েক হাজার ভক্ত অংশ নেন। রথটি গোলপাহাড়, মেহেদীবাগ, চট্টেশ্বরী, কাজীর দেউড়ি, জামালখান, আন্দরকিল্লা ও লালদীঘি ঘুরে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়। পুরো পথজুড়ে ভক্তরা রথের রশি টেনে ভগবান জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রার আশীর্বাদ কামনা করেন।
এদিকে নন্দনকাননের ঐতিহ্যবাহী তুলসীধাম মদনমোহন মন্দিরকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় রথযাত্রা। প্রায় তিন শতকের ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনে নগরের বিভিন্ন মঠ ও মন্দিরের রথ একত্রিত হয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। কক্সবাজার, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী, উখিয়া, সীতাকুণ্ড, মীরসরাই, বাঁশখালী এবং পার্বত্য এলাকার ভক্তরাও এতে যোগ দেন।
কেন্দ্রীয় রথযাত্রার উদ্বোধন করেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, রথযাত্রা এখন শুধু সনাতন সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, এটি সব সম্প্রদায়ের মানুষের সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। শতবর্ষের এ আয়োজন চট্টগ্রামের সামাজিক সম্প্রীতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ঐতিহ্যবাহী রথের পুকুরপাড় সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রামে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাইকমিশনার শ্রী হরিশ কুমার, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, কেন্দ্রীয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটির সভাপতি হিরন্ময় ধরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।
চট্টগ্রামে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাইকমিশনার শ্রী হরিশ কুমার বলেন, চট্টগ্রামের রথযাত্রার মতো ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আয়োজন শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রকাশ নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক। তিনি বলেন, এমন উৎসব মানুষে মানুষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও বন্ধন আরও দৃঢ় করে।
রথযাত্রা উপলক্ষে নগরজুড়ে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ, ট্রাফিক সদস্য এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য মোতায়েন করা হয়। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কয়েকটি সড়কে সাময়িক ট্রাফিক ডাইভারশনও কার্যকর করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আয়োজক ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় পুরো অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে ভগবান জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা রথে চড়ে গুণ্ডিচা মন্দিরে গমন করেন। নির্ধারিত সময় শেষে উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে তাঁরা মূল মন্দিরে ফিরে আসেন।