মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
রংপুরে চারজনকে হত্যা: তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, বিচার দাবিতে উত্তাল রাজপথ বাংলাদেশ হিন্দু ছাত্র মহাজোট চট্টগ্রাম জেলা শাখার নতুন কমিটি অনুমোদন একটি পরিবারের স্বপ্নের নির্মম পরিসমাপ্তি: রংপুরে একই পরিবারের চারজন নিহত রাউজানে মন্দির থেকে স্বর্ণ-রৌপ্য চুরি, মুসলিম তরুণ গ্রেপ্তার রংপুরে চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনায় দুইজন আটক রংপুরে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় হিন্দু পরিবারের তিন সদস্যকে কুপিয়ে গুরুতর আহত রংপুরের, মাহিগঞ্জে গোবিন্দ মন্দিরে গীতা স্কুলের উদ্বোধন, শিশু-কিশোরদের হাতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মহানগর পূজা কমিটির নতুন নেতৃত্বকে ঢাকেশ্বরী মাতৃসেবা সংঘের শুভেচ্ছা রাঙ্গুনিয়ায় ‘চন্দ্রলোক’ ভাবনায় গণেশ চতুর্থীর আয়োজন, প্রতিমা গড়ছেন তমল পাল

সংবিধানে সমতার নিশ্চয়তা, সমাজে বৈষম্যের বাস্তবতা: দলিত (হরিজন) জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও জীবনসংগ্রাম

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
  • ৫৩ বার পড়া হয়েছে

প্রতিবেদন: সুজিত ঘোষ|| লেখক, কলামিস্ট, কবি ও সংগঠক

বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের সমতা, মানবিক মর্যাদা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার নিশ্চয়তা এবং ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবুও স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর দেশের একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে “হরিজন” নামে পরিচিত এবং বর্তমানে যাদের অনেকেই “দলিত” পরিচয় ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এখনও শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে নানা বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে।

 

মানবাধিকার সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে রবিদাস, ডোম, হাড়ি, বাউরি, লালবেগী, মেথরসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় রয়েছে। ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে এসব সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ নির্দিষ্ট কিছু পেশায় নিয়োজিত। আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির বিকাশ সত্ত্বেও জন্মগত পরিচয়ের কারণে অনেক পরিবার এখনো পেশাগত বৈচিত্র্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার চক্র অব্যাহত রয়েছে।

 

শিক্ষাক্ষেত্রেও দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুরা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। দারিদ্র্য, সামাজিক অবজ্ঞা, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং বিদ্যালয়ে অনুকূল পরিবেশের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়েই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে সীমিত প্রবেশাধিকার তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত করে। বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে।

 

বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় বহু দলিত পরিবার এখনো অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন কলোনিতে বসবাস করছে। বিশুদ্ধ পানীয় জল, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, নিরাপদ আবাসন এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব তাদের জীবনমানকে প্রভাবিত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের জন্য এই বৈষম্য দূর করা জরুরি।

 

সামাজিক বৈষম্যও দলিত জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সমস্যা। বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, এখনো অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক পরিচয়ের কারণে অবজ্ঞা, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং সামাজিক দূরত্বের অভিযোগ পাওয়া যায়। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্ম, পেশা বা সামাজিক পরিচয় কোনো ব্যক্তির মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে না; এ ধরনের বৈষম্য সংবিধানের চেতনা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী।

 

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদসমূহের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে বৈষম্যহীনতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, আইনি নিশ্চয়তা এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনো একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। এ ব্যবধান কমাতে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাবৃত্তি সম্প্রসারণ, কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিরাপদ আবাসন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান বৈষম্যবিরোধী আইনের কার্যকর প্রয়োগ। একই সঙ্গে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

 

মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা ও মানবিকতার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি কতটা ন্যায়সঙ্গত আচরণ করছে তার মাধ্যমে। দলিত জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক এবং দেশের স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার অংশীদার। তাই তাদের অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত।

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews