
উনিশ শতকের শেষভাগে ভারতীয় সমাজ ছিল এক গভীর সংকটের মুখে। একদিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও জাতিভেদ প্রথার দাপট; অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এক শ্রেণির মানুষের ধর্মবিমুখতা সব মিলিয়ে সমাজজীবনে নেমে আসে অস্থিরতা। অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ে মানুষ যখন দিশেহারা, ঠিক সেই সময় প্রেম, মানবতা ও সত্যের বাণী নিয়ে আবির্ভূত হন শ্রীশ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর। সত্য সনাতন টিভি
এই মহান সাধকের আবির্ভাবের ১৫৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ফরিদপুরের শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গনে শুরু হয়েছে নয় দিনব্যাপী ধর্মীয় উৎসব। ২৪ এপ্রিল শুরু হওয়া এই আয়োজন চলবে ২ মে পর্যন্ত। প্রতিদিন ধর্মীয় আচার, নামসংকীর্তন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবস্থল মুখরিত হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৭১ সালের ২৮ এপ্রিল (বাংলা ১২৭৮ সালের ১৬ বৈশাখ), পবিত্র সীতানবমী তিথিতে মুর্শিদাবাদ জেলার ডাহাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর। তাঁর পিতা দীননাথ ন্যায়রত্ন ও মাতা বামা দেবী। পরবর্তীতে তিনি পিতার সঙ্গে ফরিদপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। শহরের নিকটবর্তী ব্রাহ্মণকান্দা এলাকায় তাঁদের স্থায়ী আবাস গড়ে ওঠে এবং গোয়ালচামটে অবস্থিত শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন হয়ে ওঠে তাঁর লীলাভূমি। সত্য সনাতন টিভি
প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত মাত্র ৫০ বছর। ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ১ আশ্বিন তিনি ফরিদপুরের শ্রীঅঙ্গনেই লীলা সংবরণ করেন। তবে এই স্বল্প সময়েই তিনি সমাজে প্রেম, ভক্তি ও মানবতার যে বীজ বপন করেছিলেন, তা আজও অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, তাঁর জীবন ও দর্শনের দুটি প্রধান দিক ছিল সামাজিক ও আধ্যাত্মিক। তিনি এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন, যখন শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর প্রচারিত প্রেম ও ভক্তির আদর্শ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। ইংরেজ শাসনের প্রভাবে সমাজে জড়বাদ ও ভোগবাদিতা বাড়তে থাকে, ফলে মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে জগদ্বন্ধু সুন্দর মানুষের মাঝে প্রেম, সহমর্মিতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানান। তাঁর শিক্ষা ছিল বিভেদ নয়, ঐক্যের; হিংসা নয়, ভালোবাসার।
ফরিদপুরে আয়োজিত এবারের উৎসব সেই চিরন্তন বার্তাকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে মানুষের মাঝে মানবতা ও প্রেমই পারে সমাজকে আলোকিত করতে।