
নিজস্ব প্রতিবেদন : সত্য সনাতন টিভি || অনলাইন সংস্করণ
“জমির দলিল দে, নইলে জীবন দে”এমন হুমকি নাকি এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কয়েকটি সংখ্যালঘু পরিবারের কাছে। তাদের অভিযোগের তীর সরাসরি ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব আলমের দিকে। জমি দখল থেকে শুরু করে মামলা গ্রহণে অনীহা, অর্থের বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়া, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারএমন নানা অভিযোগে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে ভোগদখলে থাকা পৈত্রিক সম্পত্তি রক্ষার জন্য এখন তাদের লড়াই করতে হচ্ছে প্রশাসনিক প্রভাব ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ বলছেন, “জীবন চলে যাক, তবুও পৈত্রিক ভিটেমাটি ছাড়ব না।”
ফতুল্লার আশাপূর্ণ মণ্ডল ও পশুরাম মণ্ডল পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি দখলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে নানা কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। কখনো ভয়ভীতি, কখনো প্রভাবশালী মহলের চাপ—সব মিলিয়ে তারা এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
পরিবারটির এক সদস্য বলেন, “আমরা সংখ্যালঘু বলেই হয়তো আমাদের জমি সহজ টার্গেট মনে করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাছে জমির সব কাগজপত্র রয়েছে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি কোনোভাবেই ছেড়ে দেব না।”
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি এমন অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারহীনতার আশঙ্কা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ওসি মাহবুব আলমকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ। আদালত সূত্রে জানা যায়, দুবাইফেরত এক প্রবাসী যুবককে অপহরণ, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুট এবং মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় থানায় মামলা না নেওয়ায় ভুক্তভোগী আদালতের শরণাপন্ন হন।
মামলার নথি অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জের চর মুক্তারপুর এলাকার বাবু (২৫) গত ১৪ মে রাতে দুবাই থেকে দেশে ফেরেন। অভিযোগ রয়েছে, ফতুল্লার কাশীপুর এলাকায় পৌঁছালে কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি তার পথরোধ করে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে তার কাছ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নগদ অর্থ ও ১০ ভরি স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফতুল্লা থানার ওসিকে তিন ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে কোনো প্রতিবেদন জমা না পড়ায় বিচারক ওসির বিরুদ্ধে শোকজ আদেশ জারি করেন বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে। আদালতের নির্দেশনার পরপরই অপহৃত প্রবাসীকে উদ্ধার করে পুলিশ।
এদিকে সম্প্রতি বিতর্কিত ইট ও বালু ব্যবসায়ী সালাউদ্দিনকে আটক করে পরবর্তীতে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ওসির বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, সালাউদ্দিনকে প্রায় ১০ ঘণ্টা থানায় আটকে রাখার পর মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে মুক্তি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সালাউদ্দিন নিজেই অভিযোগ করে বলেন, “আমার মান-সম্মান যা নষ্ট হওয়ার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত টাকা দিয়েই মুক্তি পেতে হয়েছে।”
তবে সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে এক নারীকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ধর্ষণ এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী নারী দাবি করেছেন, তার সঙ্গে কোনো আপস-মীমাংসা হয়নি। অথচ মামলাটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পুলিশ প্রশাসনের ভেতর থেকেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের কথা শোনা যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “একজন থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি বারবার এমন অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।”
তার ভাষায়, “পুলিশের দায়িত্ব মামলা গ্রহণ ও তদন্ত করা। কোনো মামলার আপস-মীমাংসা বা বিচার করার এখতিয়ার থানার নেই।”
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি মাহবুব আলম। তিনি বলেন, “আমি নিয়মের বাইরে কোনো কাজ করি না। জমি দখল কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
অভিযোগ রয়েছে, ওসির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্যও বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি প্রতিবেদনের কাজ চলাকালে এক ব্যক্তি ফোন করে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং অন্যথায় ‘খারাপ পরিণতির’ ইঙ্গিত দেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিযোগে নাম আসা ডা. বাছেদুর রহমান সোহেলের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ, অভিযোগগুলো শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; বরং আইন, বিচার এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্গেও জড়িত। তারা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে সত্য উদঘাটনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।