
নিজস্ব প্রতিবেদন : সত্য সনাতন টিভি | অনলাইন সংস্করণ
যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ জাদুঘরে সংরক্ষিত মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার ঐতিহাসিক বাগদেবী (দেবী সরস্বতী) মূর্তি ভারতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে নতুন গতি এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে আদালত, প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের দাবির বিষয়টি এবার আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভারত সরকার আশা করছে, ভোপালে অনুষ্ঠিত ব্রিকস (BRICS) সংস্কৃতি বিষয়ক বৈঠকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে এবং সেই আলোচনায় বাগদেবীর মূর্তি প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও প্রাধান্য পাবে।
ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলে বিদেশে নিয়ে যাওয়া মূর্তি, ভাস্কর্য ও অন্যান্য প্রত্নসম্পদ নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তাব উত্থাপন করবে ভারত। সরকারের মতে, এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নয়; বরং জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জনগণের আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার ঐতিহাসিক ভোজশালা চত্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত বাগদেবীর মূর্তিটি বহু বছর ধরে ব্রিটিশ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে মূর্তিটি ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি সচিব বিবেক আগারওয়াল জানান, মধ্যপ্রদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাওয়ার পর থেকেই কেন্দ্র সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মূর্তি ফিরিয়ে আনার আবেদন পাওয়া যায় এবং এরপর থেকে যুক্তরাজ্যে ভারতের কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে ব্রিটিশ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে গত ১৫ মে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ভোজশালা–কামাল মৌলা চত্বর সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বিরোধপূর্ণ স্থানটিকে দেবী সরস্বতী বা বাগদেবীর মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে ২০০৩ সালে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (এএসআই) সেই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যার আওতায় সেখানে শুক্রবার মুসলিমদের নামাজ আদায়ের অনুমতি ছিল। আদালত সরকারকে ব্রিটিশ জাদুঘর থেকে বাগদেবীর মূর্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও প্রদান করে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সাদা মার্বেলে নির্মিত বাগদেবীর মূর্তিটি পরমার রাজবংশের সময়কার এবং একাদশ শতকের নিদর্শন বলে ধারণা করা হয়। প্রায় ১ দশমিক ২৮ মিটার উচ্চতা ও ২৫০ কিলোগ্রাম ওজনের এই মূর্তির গায়ে থাকা শিলালিপিতে ধারের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্কের উল্লেখ রয়েছে। ব্রিটিশ জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, মেজর জেনারেল উইলিয়াম কিনকেইডের কাছ থেকে সংগ্রহের পর ১৯০৯ সালে মূর্তিটি জাদুঘরের স্থায়ী সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
৫ ও ৬ আগস্ট ভোপালে ব্রিকস সংস্কৃতি কর্মদলের তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরপর ৬ ও ৭ আগস্ট ব্রিকস সাংস্কৃতিক উৎসব এবং ৭ ও ৮ আগস্ট সদস্য দেশগুলোর সংস্কৃতিমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ব্রিকসের ১১টি পূর্ণ সদস্য দেশের মধ্যে ১০টি দেশের প্রতিনিধি এতে অংশ নিচ্ছেন; শুধুমাত্র সৌদি আরব এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছে না।
ভারত সরকার জানিয়েছে, এই বৈঠকে বিদেশ থেকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের বিষয়ও তুলে ধরা হবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৬৫৩টি প্রাচীন নিদর্শন ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এর আগে উদ্ধার করা হয়েছিল মাত্র ১৩টি নিদর্শন। ফলে বর্তমানে দেশে ফিরিয়ে আনা মোট প্রত্নসম্পদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬৬টি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও চোল ও বিজয়নগর যুগের বেশ কয়েকটি মূল্যবান ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ভারতে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্বাদশ শতকের সোমাস্কন্দ মূর্তি, ষোড়শ শতকের সন্ত সুন্দরার ও পরাবাইয়ের মূর্তি। এছাড়া চোল যুগের বিখ্যাত শিব নটরাজ মূর্তিটিও যুক্তরাষ্ট্রে প্রদর্শনী শেষে ভারতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়াও তামিলনাড়ুর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ একটি পাথরের নন্দী, ভদ্রকালীর প্রতিকৃতি খোদাই করা ধাতব ত্রিশূল এবং ছয়-মাথাবিশিষ্ট কার্তিকেয় মূর্তি ভারতের কাছে ফিরিয়ে দিতে সম্মতি জানিয়েছে।
ভারত সরকারের ভাষ্য, দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন বিদেশ থেকে পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে বিষয়টি আরও শক্তভাবে উপস্থাপন করা হবে।