
নিজস্ব প্রতিবেদন : সাগর শীল সুজন || মাদারীপুর প্রতিনিধি
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়েছে। তাঁদেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস—যাঁর অসাধারণ সাহসিকতা, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তবে তাঁকে ঘিরে একটি দীর্ঘদিনের দাবি হলো, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাবের জন্য বিবেচনার কথা প্রচারিত হলেও স্বাধীনতার পর তিনি সেই স্বীকৃতি পাননি। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক এবং তাঁর অনুরাগীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জিতেন্দ্র চন্দ্র দাস ও হরিমতি দাসের ঘরে জন্ম নেওয়া জগৎজ্যোতি দাস ১৯৭১ সালে এইচএসসি শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমের চেতনার বিকাশ ঘটে। পরে ভারতে অবস্থানকালে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
মুক্তিযুদ্ধে তিনি গড়ে তোলেন ‘দাস পার্টি’, যার নেতৃত্বে ভাটি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে একের পর এক সফল অভিযান পরিচালিত হয়। টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের অধীনে দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার জলপথে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত গেরিলা অভিযান পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, বানিয়াচং এলাকায় মাত্র ১৩ জন সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বড় দলকে প্রতিরোধ করেন। একইভাবে জামালগঞ্জ থানা, সাচনাবাজার নৌবন্দর এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে মুক্তিযোদ্ধারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। বদলপুর সেতু ধ্বংসের মতো কৌশলগত অভিযানেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
জগৎজ্যোতি দাসের বীরত্বের খবর সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তারাও তাঁর রণকৌশল ও সাহসিকতার প্রশংসা করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর বানিয়াচং–বাহুবল অঞ্চলে একটি অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সুপরিকল্পিত আক্রমণের মুখে পড়েন। সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে গোলাবারুদ ফুরিয়ে এলে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং শহীদ হন।
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ, গবেষণা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, তাঁর মরদেহ পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা অবমাননার শিকার হয়। এসব বিবরণ মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতার একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার জগৎজ্যোতি দাসকে বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত করে। তবে তাঁর অনুরাগী, গবেষক এবং অনেক মুক্তিযোদ্ধার দাবি, তাঁর অসাধারণ বীরত্ব ও আত্মত্যাগের তুলনায় আরও উচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রাপ্য ছিল। এ দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও মতামত প্রকাশিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জগৎজ্যোতি দাস এক অমর নাম। ব্যক্তিগত জীবনের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে তিনি মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর বীরত্ব, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম ও সাহসিকতার এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।