
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত জনপদে হাসপাতাল অনেক সময় দূরের বিষয়। এখানে দূরত্ব মাপা হয় নদী, খাল আর নৌপথের হিসাব দিয়ে। এমন বাস্তবতায় একজন অভিজ্ঞ ধাত্রীর উপস্থিতি অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দেয়।
সুন্দরবনের সেই নির্ভরতার নাম দেবলা মণ্ডল। বয়স এখন সত্তরের কোঠায়। কিন্তু ক্লান্তি যেন তাকে ছুঁতে পারে না। গত ৫৪ বছরে তিনি হাতে ধরে পৃথিবীতে এনেছেন প্রায় আড়াই হাজার শিশুকে। গ্রামের বহু পরিবারের কাছে তিনি শুধু একজন দাইমা নন, তিনি জীবনের প্রথম আশ্বাস। সত্য সনাতন টিভি
সাক্ষাৎকারের সময় দেবলা মণ্ডল ব্যস্ত ছিলেন মশারি বাঁধার কাজে। ইট চাপা দিয়ে নিপুণভাবে মশারি আটকে দিচ্ছিলেন। বিকেলের নরম আলোয় সুন্দরবনের নদী ও বন যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল। কাজের ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছিল, এই হাতগুলো অভ্যস্ত দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় শক্ত হয়ে উঠেছে।
একসময় নিজেই বললেন,
“এই হাত দিয়েই আমি হাজারো বাচ্চাকে পৃথিবীর আলো দেখাইছি।” দেবলার দাইমা জীবনের শুরু স্বাধীনতার কয়েক বছর পর। তিনি স্পষ্ট করে বললেন, যুদ্ধের সময় নয় সব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই তিনি এই কাজে যুক্ত হন।
প্রথম যে শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন, তার নামও ভুলে যাননি। সেই শিশু এখন মাঝবয়সী, ভারতেই কোথাও বসবাস করছে। আর সর্বশেষ সন্তান জন্ম দিয়েছেন সম্প্রতি, চালনা এলাকার কাছাকাছি এক গ্রামে।
সুন্দরবনের জলবায়ু কঠিন। ছয় মাস বর্ষা, বাকি সময় লবণাক্ত পানি আর খরার চাপ। এই লবণাক্ততার কারণে নারীদের গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, জটিল প্রসব, এমনকি গর্ভপাতের ঝুঁকিও বাড়ছে।
চিকিৎসাসেবার অভাব, নৌপথ নির্ভরতা আর দূরত্ব সব মিলিয়ে এই এলাকায় অভিজ্ঞ দাইমার প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র। দেবলা মণ্ডল সেই অভাব পূরণ করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে।
সুন্দরবনে শুধু দূরত্ব নয়, বিপদেরও শেষ নেই। কখনো ঝড়, কখনো জলোচ্ছ্বাস, কখনো মাঝরাতে ডাক। দেবলা জানান, ঝড়ের মাঝেও তিনি নদী পার হয়েছেন বহুবার। একবার চলনা এলাকায় আত্মীয়ের প্রসবব্যথার খবরে ঝড়ের রাতে চোয়াল্লা ভ্যানের মাধ্যমে পৌঁছে যান তিনি। দেবলার কথায়, “ঝুঁকি আসে, কিন্তু তা অতিক্রম করতে হয়।”
দেবলা বলেন, এখন আর সরকার থেকে কোনো সরঞ্জাম বা সহযোগিতা আসে না। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা এতটাই গভীর যে প্রসবের সময় কখন অপেক্ষা করতে হবে আর কখন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে তা তিনি বুঝে ফেলেন চোখের পলকে।
তিনি বলেন, লেবার শুরু হলে সময় ঠিকমতো ধরতে না পারলে অনেক সময় বড় বিপদ ঘটে যেতে পারে।
১৯৭৮ সালে দেবলা ভারতে প্রবাস জীবন শেষ করে ফিরে আসেন। তার স্বামী নীরদ মণ্ডল ছিলেন পোস্টমাস্টার। সংসারে চার সন্তান দুই ছেলে, দুই মেয়ে। দেবলা জানান, পরিবার সবসময় তার কাজে পাশে থেকেছে।
নিজের সন্তানদের পাশাপাশি তিনি নিজের হাতেই জন্ম দিয়েছেন তার আটজন নাতি-নাতনিকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে দাইমার প্রথা কমে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এখন হাসপাতাল ও সিজারিয়ান পদ্ধতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। দেবলা এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তার ভাষায় “এখন তো কেটে ফেলে, স্পাইন ইনজেকশন দেয়। ব্যথা থাকে সারাজীবন।”
তিনি জানান, গ্রামে নবজাতককে এক সপ্তাহ ঘরে রেখে বিশ্রাম ও যত্নের যে নিয়ম ছিল, আধুনিক ব্যবস্থায় তা অনেক সময় উপেক্ষিত হয়।
বয়সের ভারে দেবলার পা কিছুটা ধীর হয়েছে। কিন্তু মানুষের বিপদে ডাক এলে তিনি বসে থাকেন না।এ দেবলার কথায়, “মানুষের বিপদে যেতে হয়। বিপদে বন্ধু হতে হয়।” সত্য সনাতন টিভি
গ্রামে হাঁটতে গেলে অনেকেই তাকে থামিয়ে দেখান বড় হয়ে ওঠা সন্তানকে। বলেন,“দেখেন, আপনার হাতের বাচ্চাটা কতো বড় হইছে!”দেবলা শুধু মাথা নেড়ে হাসেন। এত মুখ, এত শিশুর স্মৃতি সব মনে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষ তাকে মনে রেখেছে, জীবনের প্রথম আলো হিসেবে।
আজও ফোন বা বার্তা এলেই দেবলা মণ্ডল বেরিয়ে পড়েন সুন্দরবনের নদীপথে। ঝুঁকি আর দায়িত্ব একসঙ্গে কাঁধে নিয়ে তিনি ছুটে যান নতুন জীবনের আহ্বানে। সত্য সনাতন টিভি
৫৪ বছরের এই পথচলা শুধু একটি পেশা নয় এ এক সাহস, অভিজ্ঞতা আর মানবিকতার অনন্য গল্প। সুন্দরবনের হাজারো পরিবার আজও জানে, বিপদের সময় দেবলা মণ্ডল মানেই ভরসা।