মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১১:৩৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
আনোয়ারায় গৃহবধূ উদ্ধার: পারিবারিক সমঝোতায় ফিরে গেলেন স্বামীর কাছে উখিয়ায় বাংলাদেশ গীতা শিক্ষা কমিটির নতুন উপজেলা সংসদ গঠন বিয়ের আশ্বাসে সম্পর্ক, পরে বিয়ে করতে অস্বীকৃতির অভিযোগে কৃষক দলের নেতাকে গ্রেপ্তার নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজে উপাসনালয় চায় হিন্দু শিক্ষার্থীরা, ইতিবাচক সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা চট্টেশ্বরী কালীমন্দির: শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের বেদনা ও অবিনাশী বিশ্বাসের প্রতীক রাউজান পৌরসভায় শ্রীশ্রী জগন্নাথ সেবাশ্রমে জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা অনুষ্ঠিত গোসাইলডাঙ্গা শ্মশান কালীবাড়ি মন্দিরে চুরির রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেফতার মূল হোতা ১৭১তম মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস উপলক্ষে নিয়ামতপুরে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত গোপালগঞ্জে সনাতনী স্বেচ্ছাসেবী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গীতা স্কুল উদ্বোধন ধর্মীয় মন্ত্র জপের জেরে নারী হত্যার অভিযোগ, গ্রেপ্তার ১

চট্টেশ্বরী কালীমন্দির: শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের বেদনা ও অবিনাশী বিশ্বাসের প্রতীক

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদন : সত্য সনাতন টিভি || অনলাইন সংস্করণ 

চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে, পাহাড়ঘেরা শান্ত পরিবেশে অবস্থিত চট্টেশ্বরী কালীমন্দির কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের অটুট বিশ্বাসের এক অনন্য স্মারক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য ভক্তের আরাধনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা এই মন্দির আজও বহন করে চলেছে গৌরবময় অতীত, মুক্তিযুদ্ধের নির্মম স্মৃতি এবং পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণাদায়ক ইতিহাস।

 

জনশ্রুতি ও মন্দির-সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পূর্বে আর্য ঋষি, যোগী ও সাধু-সন্ন্যাসীদের তপস্যার মাধ্যমে দেবী চট্টেশ্বরীর আবির্ভাব ঘটে। ‘চট্টেশ্বরী’ অর্থ চট্টলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, আদ্যাশক্তি মহাকালীর রূপে দেবী যুগ যুগ ধরে চট্টগ্রামবাসীর মঙ্গল ও সুরক্ষার প্রতীক হয়ে বিরাজমান।

 

মন্দিরের আদি কালীমূর্তিকে ঘিরে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, খ্রিষাণগীর নামে এক মহারাজ নিমকাঠ দিয়ে দক্ষিণাকালী মাতার একটি মনোরম বিগ্রহ নির্মাণ করেছিলেন। শতাব্দীপ্রাচীন সেই নিমকাঠের মূর্তি ছিল ভক্তদের অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তির কেন্দ্র। বিশ্বাস করা হতো, আন্তরিকভাবে পূজা করলে দেবী ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন এবং জাগতিক ও পারমার্থিক কল্যাণ দান করেন।

 

পরবর্তীকালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর সরোয়াতলী গ্রামের বিশিষ্ট সাধক রামসুন্দর দেবশর্মণ দীর্ঘদিন চট্টেশ্বরী মাতার সেবায়েত হিসেবে পূজা-অর্চনার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নিষ্ঠা ও সাধনার ফলে চট্টেশ্বরী মন্দির ধীরে ধীরে সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠে।

 

মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে একটি উঁচু পাকা চত্বর। এর এক পাশে রয়েছে চট্টেশ্বরী কালীমন্দির এবং অপর পাশে শিবমন্দির। শাক্ত দর্শনের ঐতিহ্য অনুযায়ী, ভৈরবরূপে শিব এখানে দেবীর চরণতলে অবস্থান করছেন। শিবমন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন কুণ্ড, যা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে আছে।

 

কিন্তু এই প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর নেমে আসে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের বহু মন্দির, আশ্রম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো চট্টেশ্বরী কালীমন্দিরেও বর্বর হামলা চালায়। মন্দির প্রাঙ্গণে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়, সেবায়েতের বাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং বহু মূল্যবান ধর্মীয় নিদর্শন নষ্ট করা হয়।

 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ছিল শতাব্দীপ্রাচীন নিমকাঠের কালীমূর্তির ধ্বংস। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে দেবীর সেই ঐতিহাসিক বিগ্রহটি ভেঙে খণ্ডবিখণ্ড করে দেয়। যে বিগ্রহ শত শত বছর ধরে মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতীক ছিল, মুহূর্তের মধ্যেই তা পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। স্বাধীনতার পর মন্দির কর্তৃপক্ষ ও ভক্তরা ভগ্নাবশেষের যতটুকু উদ্ধার করতে সক্ষম হন, তা যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা হয়। আজও সেই আদি নিমকাঠের বিগ্রহের একটি খণ্ডিত অংশ মন্দিরে সংরক্ষিত রয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের বর্বরতার এক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে।

 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরু হয় মন্দির পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায়। মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডা. তারাপদ অধিকারী। তাঁর উদ্যোগে এবং তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী তরুণ কান্তি ঘোষসহ অসংখ্য সনাতন ধর্মাবলম্বীর সহযোগিতায় মন্দিরে নতুন কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি ও শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই পুনর্নির্মাণ শুধু একটি মন্দিরের পুনরুদ্ধার ছিল না; এটি ছিল ধ্বংসের বিরুদ্ধে বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও মানবিক চেতনার এক বিজয়গাথা।

 

বর্তমানে চট্টেশ্বরী কালীমন্দির বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু তীর্থস্থান। প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী এখানে পূজা, প্রার্থনা ও দর্শনের উদ্দেশ্যে আসেন। কালীপূজা, দীপান্বিতা অমাবস্যা, দুর্গোৎসবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে মন্দির প্রাঙ্গণ ভক্তসমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে।

 

চট্টেশ্বরী কালীমন্দিরের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় ধ্বংস করা যায় স্থাপনা, ভেঙে ফেলা যায় একটি বিগ্রহ, কিন্তু কখনো ধ্বংস করা যায় না মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং আত্মিক শক্তিকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চট্টেশ্বরী মা সেই অটল বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে আজও চট্টগ্রামের বুকে জাগ্রত রয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews