
সনাতন ধর্মে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে মাছ–মাংস ভক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করছেন“সনাতন শাস্ত্রে মাছ–মাংস ভক্ষণে কোনও নিষেধ নেই” তবে শাস্ত্রভিত্তিক বিশদ অনুসন্ধান বলছে, এ দাবি বাস্তবতা বা শাস্ত্রীয় নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং বেদ, স্মৃতি, পুরাণ ও মহাকাব্যসহ প্রায় সব সনাতনী শাস্ত্রেই হিংসা ও প্রাণীহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং আমিষ ভোজন থেকে বিরত থাকতে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সনাতন শাস্ত্রে মানুষের খাদ্যতালিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘অহিংসা’ সর্বোচ্চ নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মনুষ্যজাতির দাঁতের গঠন, পরিপাকতন্ত্র ও খাদ্যগ্রহণের স্বাভাবিক প্রকৃতি সবকিছু মিলিয়ে তাকে তৃণভোজী প্রাণীর ন্যায় বিবেচনা করা হয়েছে। তাই জিহ্বার তৃপ্তির জন্য প্রাণীহত্যাকে শাস্ত্রে বারবার নিষেধ করা হয়েছে।
মনুসংহিতা, শ্রীমদ্ভাগবত, মহাভারত ও বহু পুরাণে উল্লেখ রয়েছে ছাগল, ভেড়া, মুরগি, কবুতর, মাছসহ সংঙ্কুচিত চেতনাধারী প্রাণীদের হত্যা করে তাদের মাংস খাওয়া মহাপাপ।
মনুসংহিতা ৫/৪৫–৫৫ পর্যন্ত বহু শ্লোকে এ বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং প্রাণীহত্যাকারী ব্যক্তি জীবিতাবস্থায় ও মৃত্যুর পরে কখনোই সুখলাভ করতে পারে না বলে উল্লেখ আছে।
বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সূত্রে বলা হয়েছে, প্রাণীহত্যা ছাড়া মাংসের উৎপত্তি নেই, আর প্রাণী-বধ স্বর্গপ্রদ নয় (মনুসংহিতা ৫/৪৮)। নিজের সুখের জন্য প্রাণী হত্যা করলে ব্যক্তি কখনোই শান্তি পায় না (৫/৪৫)।
যে ব্যক্তি প্রাণীর বধ, ক্রয়, বিক্রয়, রান্না বা পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত তিনিও সমান পাপে দুষ্ট (৫/৫১)। যে মাংস খায়, তাকে পরজন্মে সেই প্রাণীই ভক্ষণ করবে শাস্ত্রে ‘মাংস’ শব্দের অর্থ এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে (৫/৫৫)।
মহাভারতে ভীষ্মদেব স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন মাংস না খাওয়ার পুণ্য অশ্বমেধ যজ্ঞের সমতুল্য (অনুশাসন পর্ব)। শ্রীমদ্ভাগবতে উল্লেখ আছে হিংসাকারী মানুষ পরজন্মে ঐ পশুর দ্বারা নিহত হয়। এভাবে শাস্ত্রসমূহে মাংস ভক্ষণকে শুধু নিরুৎসাহিতই নয়, বরং ‘মহাপাপ’ ও ‘নরকগামী’ কর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভিন্ন শাস্ত্রে পশুবলির উল্লেখ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা খুব সীমিত, নির্দিষ্ট তিথিতে, দেবীকে সাক্ষী রেখে এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস হিসেবে নয়। শাস্ত্রজ্ঞরা বলেন এটি ছিল সেই সব মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি উপায়, যারা যেকোনো সময় প্রাণী হত্যা করতে অভ্যস্ত ছিল। অর্থাৎ মূলধারার শাস্ত্রীয় অবস্থান হলো নিরামিষই মানবের স্বাভাবিক ও আদর্শ খাদ্য।
গীতা ৯/২৬–৯/২৭ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন শাক-সবজি, ফল, অন্ন, দুধজাত খাবার ভগবানকে নিবেদনযোগ্য এবং সত্ত্বিক প্রকারের খাদ্য।
এগুলোতে কোনোরূপ দুঃখ-চেতন বা হিংসা নেই।
এই কারণে সনাতনী আচার ও উপবাসে সবসময় নিরামিষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যজুর্বেদে ‘অঘ্ন্যা’ অর্থাৎ পশুহত্যা নিষিদ্ধ বারবার উল্লেখ রয়েছে। স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে পশুমাংস ও মদ দিয়ে দেবীর পূজা তামসিক; এর ফল দৈত্যত্ব।
মহাভারতে স্পষ্ট বলা হয়েছেযে ধর্মজ্ঞ, সে মন, বাক্য ও কর্ম তিন প্রকারে হিংসা ত্যাগ করে। অতএব, সনাতন ধর্মের মূলধারার কোনো শাস্ত্রই সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিত মাংস ভক্ষণের অনুমোদন দেয় না; বরং নিষেধ করে।
সনাতন ধর্মে খাদ্য হিসেবে মাছ–মাংস ভক্ষণ মোটেও প্রস্তাবিত নয়, বরং কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাপরূপে নিষিদ্ধ। মানুষের নিত্যাহার হওয়া উচিত, শাক–সবজি,ফল, অন্ন, দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য এবং ভগবানকে নিবেদনযোগ্য সত্ত্বিক উপাদানসমূহ অহিংসা, করুণা ও সত্ত্বিক জীবনই সনাতন ধর্মের মূল বার্তা।