
সনাতন ধর্মে বিদ্যা, জ্ঞান ও বাক্শক্তির দেবী হিসেবে পূজিত সরস্বতী দেবীর স্বামী নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি রয়েছে। শাস্ত্রসম্মত ও বৈদিক দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যায় সরস্বতী দেবীর কোনো স্বামী নেই। তিনি মূলত শুদ্ধ জ্ঞান ও বাণীর প্রতীক; ফলে মানবিক অর্থে গৃহস্থ সংসার বা দাম্পত্য সম্পর্ক তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
শাস্ত্রবিদদের মতে, বৈদিক সাহিত্যে সরস্বতী দেবীকে অবিবাহিতা হিসেবেই দেখা হয়েছে। তিনি কোনো পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ নন; বরং জ্ঞানতত্ত্বের মূর্ত প্রতীক। তবে পুরাণ ও লোকাচারে অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে ব্রহ্মার স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা থেকে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
তত্ত্ববিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পুরাণে সরস্বতীকে ব্রহ্মার শক্তি বা সহধর্মিণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে ‘স্ত্রী’ শব্দটি জৈবিক বা সামাজিক বিবাহ অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং শক্তিতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেই এই সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন বিষ্ণু ও লক্ষ্মী ঐশ্বর্য শক্তির প্রতীক, শিব ও পার্বতী ক্রিয়াশক্তির প্রতীক, তেমনি ব্রহ্মা ও সরস্বতী জ্ঞানশক্তির প্রতীক।
অর্থাৎ, ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্ম সম্পাদন করেন জ্ঞানের মাধ্যমে, আর সেই জ্ঞানই সরস্বতী। এই কারণেই তাঁকে ব্রহ্মার শক্তি বলা হয় মানবিক অর্থে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হিসেবে নয়। সত্য সনাতন টিভি
এ প্রসঙ্গে কঠোপনিষদের একটি বাণী উল্লেখ করা হয়
“নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যঃ” (কঠোপনিষদ ১.২.২৩),
যার ভাবার্থ হলো জ্ঞান কোনো পারিবারিক বা ইন্দ্রিয়গত সম্পর্কের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; আত্মজ্ঞান দ্বারাই তা উপলব্ধ হয়।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণেও (৩.১২.২৭) সরস্বতীর আবির্ভাব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে
তস্যৈব বদনাদ্ দেবী সরস্বত্যজায়ত।
যেনাসৌ সৃজতি লোকান্ বেদজ্ঞানবিবেকতঃ॥
(শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ৩.১২.২৭)
অনুবাদ:তাঁরই (ব্রহ্মার) মুখ থেকে দেবী সরস্বতীর আবির্ভাব হয়,যাঁর দ্বারা ব্রহ্মা বেদজ্ঞান ও বিবেকের মাধ্যমেএই সমস্ত লোকের সৃষ্টি কার্য সম্পাদন করেন।
এখানেও দেখা যায় ব্রহ্মার মুখ থেকেই দেবী সরস্বতীর প্রকাশ ঘটে, যাঁর দ্বারা ব্রহ্মা বেদজ্ঞান ও বিবেকের মাধ্যমে সৃষ্টি কার্য সম্পন্ন করেন।
সব মিলিয়ে শাস্ত্র ও তত্ত্ব অনুযায়ী একথাই স্পষ্ট লোককথা ও পুরাণিক রূপকে সরস্বতী দেবী ব্রহ্মার শক্তি হলেও, বৈদিক ও শাস্ত্রসম্মত দৃষ্টিতে তাঁর কোনো স্বামী নেই।