নিজস্ব প্রতিবেদক : সত্য সনাতন টিভি | অনলাইন সংস্করণ
জীবদ্দশায় ধর্ম, আচার ও বিশ্বাসে পার্থক্য থাকলেও মৃত্যুর পর একই প্রাঙ্গণে শেষ আশ্রয় হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের। গাজীপুরের মনিপুরে অবস্থিত বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের কবরস্থানে পাশাপাশি রয়েছে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সমাধি।
তবে সবার শেষকৃত্য একইভাবে সম্পন্ন হয় না। যার যে ধর্মীয় পরিচয়, মৃত্যুর পর তার শেষ বিদায়ও দেওয়া হয় সেই ধর্মের রীতি অনুযায়ী। হিন্দুদের ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মীয় রীতি, মুসলিমদের ক্ষেত্রে ইসলামী নিয়ম এবং খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে খ্রিষ্টীয় প্রথা অনুসরণ করা হয়। সত্য সনাতন টিভি
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েক বিঘা জায়গাজুড়ে থাকা কবরস্থানে সারি সারি কবর। কোথাও নতুন মাটির চিহ্ন, কোথাও আবার সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যাওয়া সমাধি। কবরস্থানের বিভিন্ন অংশে ধর্মভেদে আলাদা চিহ্ন ও ব্যবস্থাও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো প্রবীণের মৃত্যু হলে প্রথমে তাঁর স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিতে চাইলে তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর স্বজনেরা মরদেহ গ্রহণ না করলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়।
হিন্দু কোনো বাসিন্দার মৃত্যু হলে স্বজনেরা চাইলে মরদেহ নিয়ে গিয়ে সৎকার করতে পারেন। তা সম্ভব না হলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়। একইভাবে মুসলিম ও খ্রিষ্টান বাসিন্দাদের ক্ষেত্রেও তাঁদের নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়ম মানার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা সাবিনা বলেন, ‘কেউ মারা গেলে প্রথমে স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। স্বজনেরা মরদেহ নিতে চাইলে নিয়ে যান। হিন্দুদের ক্ষেত্রেও তাঁদের স্বজনেরা চাইলে মরদেহ নিয়ে গিয়ে সৎকার করেন। আর এখানে সমাহিত করা হলে ধর্ম অনুযায়ী আলাদা জায়গায় কবর দেওয়া হয়।’
আরেক বাসিন্দা মনোয়ারা বলেন, ‘যাদের কেউ নেই, তাঁদের এখানেই শেষ ব্যবস্থা করা হয়। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ থাকেন। মৃত্যুর পরও ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই কেন্দ্রে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে বসবাস করতে দেখে আসছেন। তাঁর ভাষ্য, মৃত্যুর পরও তাঁদের অনেকের শেষ ঠিকানা হয় এই প্রতিষ্ঠানের কবরস্থান।
বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের হোস্টেল সুপার হাবিবা খন্দকার বলেন, ‘আমাদের এখানে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ থাকেন। কেউ মারা গেলে প্রথমে তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে জানানো হয়। তাঁরা নিতে চাইলে মরদেহ তাঁদের কাছে দেওয়া হয়। না নিলে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়। ধর্ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট রীতিও অনুসরণ করা হয়।’
তিনি জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে এই কবরস্থানে প্রায় দুই হাজার মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে।
জানা যায়, ১৯৮৭ সালে ভাড়া বাড়িতে খাতীব আব্দুল জাহিদ মুকুলের উদ্যোগ ও অর্থায়নে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ১৯৯৪ সালে এটি গাজীপুরের মনিপুর এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। প্রায় ৭২ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটিতে প্রবীণদের থাকা, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালনের ব্যবস্থা রয়েছে।
বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন প্রবীণ বসবাস করছেন। প্রতিষ্ঠানটির মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ জন।
কেন্দ্রটির বাসিন্দাদের অনেকেই জীবনের শেষ বয়সে পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। কারও পাশে থাকার মতো আপনজন নেই, আবার কেউ নানা কারণে পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি। ফলে জীবনের শেষ সময়ের মতো মৃত্যুর পরও এই প্রতিষ্ঠানই অনেকের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
কবরস্থানটির প্রধান ফটকের পাশে থাকা সাইনবোর্ডে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য নির্ধারিত স্থানের উল্লেখ রয়েছে। কবরস্থানের ভেতরেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। মুসলিমদের জানাজা পড়ার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট স্থান। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
জীবনের শেষ বয়সে এসে একই ছাদের নিচে বসবাস, একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং মৃত্যুর পর একই প্রতিষ্ঠানের সীমানায় শেষ আশ্রয় নেওয়ার এই বাস্তবতা গাজীপুরের মনিপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রকে দিয়েছে আলাদা এক মানবিক পরিচয়। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও এখানে প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস ও শেষকৃত্যের রীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।