নিজস্ব প্রতিবেদন : সুজিত ঘোষ, লেখক, কলামিস্ট, কবি ও সংগঠক
ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ‘কৌশিকী অমাবস্যা’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত। শাক্ত ও তান্ত্রিক সাধনায় এই তিথির রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। দেবী কৌশিকীর পৌরাণিক আখ্যান, মা তারা ও মা কালীর উপাসনা এবং বাংলার দীর্ঘদিনের শক্তিসাধনার ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌশিকী অমাবস্যা গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা, উপবাস, মন্ত্রজপ ও সাধনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা এই তিথি পালন করেন। ফলে কৌশিকী অমাবস্যা শুধু ধর্মীয় নয়, বাংলার লোকসংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে কৌশিকী অমাবস্যার তাৎপর্য কি কেবল পূজা, উপবাস, মন্ত্রজপ কিংবা মন্দিরে প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে কতটা প্রাসঙ্গিক সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
দেবী মাহাত্ম্যের পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, পার্বতীর দেহকোষ থেকে কৌশিকী দেবীর আবির্ভাব এবং পরবর্তীতে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম শাক্ত দর্শনের একটি গভীর প্রতীক। দেবী এখানে শুধু অলৌকিক কোনো চরিত্র নন; তিনি শুভশক্তি, ন্যায়, সাহস ও চেতনার প্রতীক। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দেবীর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই বার্তাই প্রতিফলিত হয় যে, অন্যায় যতই শক্তিশালী হোক, তার বিরুদ্ধে শুভশক্তির জাগরণ অপরিহার্য।
বর্তমান সমাজেও এই বার্তার গুরুত্ব অপরিসীম। চারপাশের অন্ধকার কেবল রাতের অন্ধকার নয়; মানুষের লোভ, হিংসা, অহংকার, প্রতারণা, বৈষম্য, অন্যায় এবং অসহায় মানুষের প্রতি উদাসীনতাই প্রকৃত সামাজিক অন্ধকার। আর সেই অন্ধকার দূর করার শক্তি হলো জ্ঞান, বিবেক, সত্য, ন্যায় ও মানবিকতা।
তাই কৌশিকী অমাবস্যা হতে পারে আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক দায়বদ্ধতারও একটি বিশেষ দিন। দেবীর সামনে শত প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি একজন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে কথা বলাও হতে পারে প্রকৃত শক্তিসাধনার অংশ।
ধর্মের সৌন্দর্য যেমন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে নিহিত, তেমনি তার সর্বোচ্চ প্রকাশ মানবিকতার মধ্যেও। তাই কৌশিকী অমাবস্যায় আমাদের প্রত্যয় হতে পারে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, দুর্বলকে অবহেলা না করা, নারীর প্রতি অসম্মানকে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং ধর্মের নামে কুসংস্কারের পরিবর্তে বিবেক, মানবতা ও সত্যকে ধারণ করা।
অমাবস্যার ঘন অন্ধকার তাই আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আলো শুধু বাইরে জ্বালালেই হয় না, প্রথমে তা জ্বালাতে হয় নিজের অন্তরে।
কৌশিকী অমাবস্যায় মা কৌশিকীর কাছে প্রার্থনা আমাদের শক্তি দাও, সেই শক্তি যেন অহংকারে নয়, মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। জ্ঞান দাও, যাতে অন্ধবিশ্বাস নয়, সত্যকে অনুসরণ করতে পারি। আর এমন সাহস দাও, যাতে অন্যায় ও অশুভের অন্ধকার ভেদ করে আমরা আলোর পথে দাঁড়াতে পারে।