নিজস্ব প্রতিবেদন : সৌরভ সাহা | রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি
দোলনায় দুললেন রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ, চারদিকে ধ্বনিত হলো হরিনাম। ভক্তদের কণ্ঠে ভজন-কীর্তন আর আরতির আলোয় সৃষ্টি হলো এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক পরিবেশ। রাধা-কৃষ্ণের দিব্য প্রেমলীলা স্মরণ ও তাঁদের চরণে ভক্তি নিবেদনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সমাপ্ত হয়েছে কয়েকদিনব্যাপী পবিত্র ঝুলনযাত্রা উৎসব।
গত ২৩ আগস্ট রবিবার থেকে উপজেলার দক্ষিণ সাবেক রাঙ্গুনিয়ার সমভাব আদিত্য ধাম ও রাধাগোপীনাথ মন্দিরে শুরু হওয়া এ ধর্মীয় আয়োজন চলে ২৮ আগস্ট শুক্রবার পর্যন্ত। উৎসবের প্রতিটি দিনই ছিল পূজা-অর্চনা, আরতি, নামসংকীর্তন, ভজন ও কীর্তনে পরিপূর্ণ।
ঝুলনযাত্রাকে ঘিরে মন্দির প্রাঙ্গণ সাজানো হয় ভক্তিময় পরিবেশে। রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহকে সুসজ্জিত দোলনায় অধিষ্ঠিত করে বৈষ্ণবীয় রীতি অনুসারে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার। সন্ধ্যা নামতেই কীর্তনের সুর ও হরিনামের ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মন্দির চত্বর।
সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে ঝুলনযাত্রা শুধু একটি উৎসব নয় এটি রাধা-কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলার এক অপূর্ব স্মরণোৎসব। ভক্তদের বিশ্বাস, বৃন্দাবনের কুঞ্জবনে রাধা-কৃষ্ণের যে আনন্দময় দোললীলা, ঝুলনযাত্রার মাধ্যমে সেই লীলারই ভাবস্মরণ করা হয়।
দোলনায় যুগলবিগ্রহকে দোলানোর সময় ভক্তরা তাঁদের হৃদয়ের ভক্তি, প্রেম ও আত্মসমর্পণ নিবেদন করেন। বৈষ্ণবীয় দর্শনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে পার্থিব সম্পর্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবাত্মা ও পরমাত্মার চিরন্তন সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
উৎসবের দিনগুলোতে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে ভক্তরা মন্দিরে সমবেত হন। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবস্থলে তৈরি হয় মিলনমেলার আবহ।
পূজা ও আরতির পর ভক্তরা সম্মিলিতভাবে নামসংকীর্তন ও ভজন-কীর্তনে অংশ নেন। ‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্র ও হরিনামের ধ্বনিতে মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। অনেক ভক্ত যুগলবিগ্রহ দর্শন করে নিজেদের, পরিবারের সদস্যদের এবং সমাজের শান্তি ও মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন।
২৮ আগস্ট শুক্রবার ছিল ঝুলনযাত্রার শেষ দিন। দিনটি উপলক্ষে মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ পূজা-অর্চনা ও আরতি। পরে নামসংকীর্তন, ভজন ও কীর্তনের মধ্য দিয়ে রাধা-কৃষ্ণের চরণে ভক্তি নিবেদন করেন উপস্থিত ভক্তরা।
উৎসবের শেষ মুহূর্তে অনেকের চোখেমুখে ছিল আনন্দ ও আবেগের ছাপ। কয়েকদিন ধরে একসঙ্গে ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নেওয়া ভক্তরা পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং আগামী দিনেও সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ভক্তিমূলক চর্চা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আয়োজকদের ভাষ্য, ঝুলনযাত্রার মতো ধর্মীয় আয়োজন সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতি ও বৈষ্ণবীয় ঐতিহ্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি এসব উৎসব মানুষের মধ্যে ভক্তি, প্রেম, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির চেতনা জাগ্রত করে।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা থেকে মানুষ প্রেম ও আত্মত্যাগের শিক্ষা পায়, হরিনাম থেকে পায় আত্মিক প্রশান্তির অনুপ্রেরণা। তাই ঝুলনযাত্রার অন্তর্নিহিত বার্তা কেবল মন্দিরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় ভক্তি ও মানবিকতার চেতনা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দেওয়াই এ উৎসবের অন্যতম তাৎপর্য।
হরিনামের ধ্বনি থেমেছে, দোলনার উৎসব শেষ হয়েছে কিন্তু রাধা-কৃষ্ণের প্রেম ও ভক্তির যে অমৃতধারা ঝুলনযাত্রার মধ্য দিয়ে ভক্তদের হৃদয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তা থেকে যাবে স্মৃতিতে ও সাধনায়।