নিজস্ব প্রতিবেদক : জয় দাশ | চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
সনাতনী সমাজের মধ্যে ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতি জোরদারের আহ্বানের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সনাতনী যুব সম্মেলন-২০২৬’। গত ৭ আগস্ট শুক্রবার বিকেলে নগরের রহমতগঞ্জ ঐতিহাসিক জে এম সেন হল মাঠ প্রাঙ্গণে বিভিন্ন সনাতনী সংগঠনের নেতাকর্মী ও তরুণদের অংশগ্রহণে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
বিভেদ ও মতপার্থক্য দূরে রেখে স্বজাতির অধিকার, মর্যাদা ও সামাজিক কল্যাণে তরুণদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। তারা বলেন, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে হবে নতুন প্রজন্মকে। একটি সচেতন, মানবিক ও দায়িত্বশীল যুবসমাজই ভবিষ্যতে সমাজকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
[caption id="attachment_6914" align="aligncenter" width="300"]
চট্টগ্রামে আয়োজিত সনাতনী যুব সম্মেলনে ধারণকৃত[/caption]
অনুষ্ঠানে মিঠুন দে ও প্রভা দে-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই যুব সম্মেলন উদ্বোধন করেন শ্রীমৎ স্বামী পরিতোষানন্দ গিরি মহারাজ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হাশেম বক্কর। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন লেখক, গবেষক ও বক্তা শ্রী সুদর্শন চক্রবর্তী।
অনুষ্ঠানে বক্তারা সনাতনী যুবসমাজকে সংগঠিত করার পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশের শান্তি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সব সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আয়োজন কমিটির সভাপতি অজয় দত্ত বলেন, “সনাতনী সমাজের মধ্যে যে দূরত্ব ও বিভেদ রয়েছে, তা দূর করে সবাইকে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসাই এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে তরুণদের নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং সমাজের কল্যাণে তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতেই এ আয়োজন। মত ও পথের পার্থক্য ভুলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আর কে দাশ রুপু, কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থ, বাংলাদেশ জাগো হিন্দু পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা মিলন কান্তি শর্ম্মা, ইসকন প্রবর্তক শ্রী-কৃষ্ণ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারী এবং নন্দনকানন ইসকন মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক তারক নিত্যানন্দ গৌরাঙ্গ দাস ব্রক্ষচারী,পটিয়া মহিরা শ্মশান কালি মন্দিরের অধ্যক্ষ পরিতোষা নন্দ মহারাজ।
এতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সনাতনী ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। উপস্থিত সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল, বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ,গুজাগুরি পূজা উদযাপন পরিষদ, গোল পাহাড় মহাশ্মশান কালী মন্দির, ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির, নন্দনকানন ইসকন মন্দির, শ্রীশ্রী তুলসীধাম চট্টগ্রাম, জাগো হিন্দু পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট,
রাম সেবক, বাংলাদেশ হিন্দু সংহতি, সনাতনী বীর সংঘ, বাংলাদেশ সনাতনী স্বেচ্ছাসেবী ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ সনাতন ফাউন্ডেশন, সনাতনী মুচকি হাসি,
শারদাঞ্জলী ফোরম, নিঃস্বার্থ নবজীবন সংগঠন, আমরা সবাই সনাতনী সংগঠন, বাংলাদেশ সংখ্যালঘু সম-অধিকার, সচেতন সনাতনী নাগরিক ও বাংলাদেশ সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলন সহ আরো অনেক সংগঠন।
[caption id="attachment_6911" align="aligncenter" width="300"]
বক্তব্য দেওয়া কালে অধীর শীল[/caption]
সম্মেলনে অধীর শীল বলেন, “যে চট্টগ্রামে জন্ম হয়েছে বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনের, যে চট্টগ্রামে জন্ম হয়েছে বীর শহীদ নূতন চন্দ সিংহ,যে চট্টগ্রামে জন্ম নিয়েছেন জ্যোতিষানন্দ পুরী গিরি মহারাজ, যে চট্টগ্রামে জন্ম নিয়েছেন অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজ,যে চট্টগ্রামের মাটিতে জন্মেছেন বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, আমরা সেই গৌরবময় চট্টগ্রামের অধিবাসী।
এই চট্টগ্রামের বুক চিরে বয়ে গেছে কর্ণফুলী নদী, এই চট্টগ্রামের মাটিকে সিক্ত করেছে হালদা নদী, বয়ে গেছে শঙ্খ নদী। এই মাটি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ নয়, এই মাটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের মাটি।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মাটির জন্য লড়াই করেছেন, সমাজ ও দেশের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি। আজকের তরুণ সমাজকে সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
আমরা বিভেদ চাই না, আমরা চাই ঐক্য। মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু স্বজাতির স্বার্থে আমাদের এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে ধারণ করে শিক্ষা, মানবসেবা, সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।
চট্টগ্রামের এই ঐতিহাসিক মাটি থেকে আজ আমাদের অঙ্গীকার হোক, আমরা পরস্পরের পাশে থাকব, একে অপরকে সহযোগিতা করব এবং দেশের শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করব। যে চট্টগ্রাম ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, সেই চট্টগ্রামের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে।”
আয়োজকেরা জানান, সনাতনী সমাজের বিভিন্ন সংগঠন ও তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো, সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি এবং অধিকার ও সংস্কৃতি রক্ষায় যুবসমাজকে আরও সক্রিয় করাই সম্মেলনের অন্যতম উদ্দেশ্য।