নিজস্ব প্রতিবেদন : সত্য সনাতন টিভি |অনলাইন সংস্করণ
একসময় এখানে ছিল রাজকীয় প্রাসাদ। ছিল রাজা, জমিদারি, পাইক-বরকন্দাজ আর প্রজাদের আনাগোনা। ছিল ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তির গল্প। সময়ের স্রোতে সেই রাজা নেই, রাজ্য নেই, নেই প্রাসাদের জৌলুসও। ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে নলডাঙ্গা রাজবংশের সেই রাজকীয় অধ্যায়। কিন্তু বেগবতী নদীর তীরে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে সাতটি প্রাচীন মন্দির। যেন কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বুকের ভেতর ধারণ করে তারা অপেক্ষা করছে নতুন প্রজন্মের জন্য।
ঝিনাইদহ সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং কালীগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার উত্তরে নলডাঙ্গা গ্রাম। গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বেগবতী নদীর তীরেই অবস্থিত নলডাঙ্গা রাজবাড়ির ঐতিহাসিক সাত মন্দির। কালীমাতা, লক্ষ্মী, গণেশ, দুর্গা, তারা, বিষ্ণু ও রাজেশ্বরী—সাত দেব-দেবীর নামে প্রতিষ্ঠিত এসব মন্দির আজও বহন করে চলেছে হারিয়ে যাওয়া নলডাঙ্গা রাজবংশের স্মৃতি।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরগুলোর সামনে গেলে মনে হয়, সময় যেন এখানে এসে থমকে গেছে। চারপাশে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও পুরোনো স্থাপত্যের গায়ে লেগে আছে ইতিহাসের ছাপ। রাজবাড়ির প্রাসাদ নেই, রাজকীয় আস্তানা নেই; কিন্তু মন্দিরগুলো এখনো সাক্ষ্য দিচ্ছে—একসময় এই জনপদে ছিল এক প্রভাবশালী রাজপরিবারের শাসন ও ঐতিহ্য।
জেলা তথ্য অফিস প্রকাশিত ইতিহাসগ্রন্থ ‘ঝিনাইদহ জেলার ইতিকথা’-এর বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় পাঁচশ বছর আগে বিষ্ণুদাস হাজরার হাত ধরে নলডাঙ্গা রাজবংশের সূচনা। ইতিহাসের সেই অধ্যায়ে ১৫৯০ সালে মুঘল সুবেদার মানসিংহের সঙ্গে বিষ্ণুদাস হাজরার আতিথেয়তার সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে। তাঁর আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হয়ে মানসিংহ পাঁচটি গ্রাম দান করেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
সেই জমিদারির ওপর ভিত্তি করেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে নলডাঙ্গা রাজবাড়ি। সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয় রাজবংশের প্রভাব-প্রতিপত্তি। বিভিন্ন সময়ে রাজপরিবারের শাসকদের উদ্যোগে নির্মিত হয় একাধিক মন্দির। তবে রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেব রায়ের আমলে মন্দিরগুলো পূর্ণতা লাভ করে বলে ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
১৮৭৯ সালে জমিদারির দায়িত্ব নেন রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেব রায়। পরে ১৯১৩ সালে তিনি ‘রাজা বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন। শুধু জমিদারি পরিচালনাই নয়, শিক্ষার প্রসারেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি ইন্দু ভূষণ ও মধুমতি বৃত্তি চালু করেন। ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমান সরকারি নলডাঙ্গা ভূষণ বিদ্যালয়।
কিন্তু ইতিহাস কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সময়ের পরিবর্তনে রাজতন্ত্র ও জমিদারি ব্যবস্থারও অবসান ঘটে। ১৯৫৫ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে নলডাঙ্গা রাজবংশের দীর্ঘ অধ্যায়েরও পরিসমাপ্তি ঘটে।
রাজবাড়ির মূল প্রাসাদ আজ আর নেই। নেই রাজা-জমিদারের সেই জৌলুসও। কিন্তু সাতটি মন্দির এখনো দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সাক্ষী হয়ে। কালের ক্ষয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দীর্ঘদিনের অযত্নে স্থাপনাগুলোর সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়েছে। তবু প্রাচীন নির্মাণশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে এগুলো এখনো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে ২০০৭ সাল থেকে সংস্কারকাজ শুরু হয়। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি মন্দির সংস্কার করা হয়েছে। একটি মন্দিরের সংস্কারকাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে আরও দুটি মন্দির এখনো পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।
সংস্কারের ফলে কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলেও ঐতিহাসিক এই স্থাপনাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ। তাদের প্রত্যাশা, শুধু মন্দির সংস্কার নয়—পুরো এলাকাকে ঘিরে একটি পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় নলডাঙ্গা রাজবাড়ির সাত মন্দিরের প্রাকৃতিক পরিবেশও বেশ আকর্ষণীয়। ইতিহাস, প্রাচীন স্থাপত্য ও নদীর সৌন্দর্য—তিনের সমন্বয়ে জায়গাটি হয়ে উঠতে পারে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে জায়গাটিকে আরও পরিচিত করে তুলতে প্রয়োজন প্রচার, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটকদের বসার স্থান, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা।
স্থানীয় বাসিন্দা সুভাষ দাস বলেন, “এটি আমাদের এলাকার গর্ব। এখানে আরও সংস্কার ও পর্যটন সুবিধা বাড়ানো হলে দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা আসবেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম এই এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা প্রশান্ত কুমারের মতে, “দ্রুত সংরক্ষণকাজ শেষ করা এবং পর্যটন সুবিধা বাড়ানো দরকার। নলডাঙ্গা রাজবাড়ির সাত মন্দির শুধু আমাদের এলাকার নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।”
রাজা নেই, রাজ্য নেই তবু মন্দিরপ্রাঙ্গণে থেমে যায়নি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। নিয়মিত পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে এখনো প্রাণের স্পন্দন টিকে আছে প্রাচীন এসব স্থাপনায়।
নলডাঙ্গা রাজবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত প্রান্ত কুমার বলেন, “আমি নিয়মিত মন্দিরগুলোর দেখভাল করে থাকি। এগুলো অনেক পুরোনো ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে মন্দিরগুলোর ঐতিহ্য আরও দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে।”
ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সৌন্দর্য ও সংরক্ষণ নিয়ে জেলা প্রশাসনেরও উদ্যোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন।
তিনি বলেন, “নদীর ধারে অবস্থিত মন্দিরগুলো যাতে আরও সুন্দর করা যায়, তা নিয়ে শিগগিরই কাজ শুরু করব।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। শুধু সংস্কার নয়, নলডাঙ্গা রাজবাড়ির ইতিহাসকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে—এমন প্রত্যাশাও তাদের।
নলডাঙ্গা রাজবাড়ির আজ আর কোনো রাজা নেই। নেই রাজ্য পরিচালনার সেই কোলাহল, নেই প্রাসাদের চাকচিক্য, নেই পাইক-বরকন্দাজের আনাগোনা। কিন্তু বেগবতীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা সাতটি মন্দির যেন এখনো অতীতের সেই গল্প বলে যায়।
কালের পরিক্রমায় রাজবংশ হারিয়ে গেছে, জমিদারি বিলুপ্ত হয়েছে, প্রাসাদও মুছে গেছে সময়ের গর্ভে। কিন্তু কালীমাতা, লক্ষ্মী, গণেশ, দুর্গা, তারা, বিষ্ণু ও রাজেশ্বরীর মন্দিরগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব প্রহরী হয়ে।
সঠিক সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়ন হলে নলডাঙ্গার এই সাত মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়, বরং বাংলার জমিদারি ইতিহাস, প্রাচীন স্থাপত্য ও হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল হিসেবে নতুন করে পরিচিতি পেতে পারে।