নিজস্ব প্রতিবেদন : জয় দেব নাথ
আজ পবিত্র গুরু পূর্ণিমা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দিনটি গুরু-শিষ্য সম্পর্কের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য উপলক্ষ। এই তিথিতে শিষ্যরা তাঁদের পরম আরাধ্য গুরুর সেবা, পূজা ও আশীর্বাদ গ্রহণের মাধ্যমে বিশেষ কৃপা লাভের প্রত্যাশা করেন। দেশের বিভিন্ন আশ্রম, মঠ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দিনব্যাপী গুরুপূজা, নামসংকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা, প্রসাদ বিতরণ ও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
সংস্কৃতে ‘গূ’ শব্দের অর্থ অন্ধকার এবং ‘রু’ শব্দের অর্থ সেই অন্ধকার দূরকারী। তাই ‘গুরু’ বলতে বোঝায় সেই মহাপুরুষকে, যিনি অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে জ্ঞান, সত্য ও আলোর পথে পরিচালিত করেন। তিনি শিষ্যকে তমসা থেকে জ্যোতির্ময়ের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেন এবং আত্মজ্ঞান অর্জনের দিশা দেখান।
বৈদিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে গুরুপূর্ণিমা উদযাপনের প্রচলন বহু প্রাচীন। এই দিনে শিষ্যরা তাঁদের গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদন করেন। গুরু ও শিষ্যের আত্মিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার জন্যই যুগ যুগ ধরে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। সত্য সনাতন টিভি
গুরুপূর্ণিমায় শ্রীগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অন্যতম বহুল প্রচলিত শ্লোক হলো
“গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুরেব পরংব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥”
এর অর্থ, গুরুই ব্রহ্মা, গুরুই বিষ্ণু, গুরুই মহেশ্বর। তিনিই পরম ব্রহ্মের জ্ঞানদানকারী। সেই পরম গুরুর চরণে জানাই বিনম্র প্রণাম।
শাস্ত্রমতে, মহর্ষি শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাসকে বিশ্বের আদিগুরু হিসেবে সম্মান করা হয়। বেদ, মহাভারত ও বহু পুরাণ সংকলনের মাধ্যমে মানবজাতিকে জ্ঞানের অমূল্য ভাণ্ডার উপহার দিয়েছেন তিনি। তাঁর আবির্ভাব তিথি হওয়ায় এই দিনটি ব্যাসপূর্ণিমা নামেও পরিচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, গুরু-শিষ্য পরম্পরাকে সুসংহত করতে ব্যাসদেবই গুরুপূর্ণিমা পালনের প্রথা প্রবর্তন করেন।
গুরুপূর্ণিমার গুরুত্ব শুধু সনাতন ধর্মেই নয়, বৌদ্ধ ধর্মেও সমানভাবে স্বীকৃত। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধ উত্তরপ্রদেশের সারনাথে তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে ধর্মদেশনা প্রদান করেন এই সময়ে। সেই ঘটনাকে স্মরণ করেও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা গুরুপূর্ণিমা পালন করেন। সত্য সনাতন টিভি
ধর্মীয় পণ্ডিতদের মতে, আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা সম্পূর্ণতার প্রতীক। পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদের মতোই মানুষের জীবনও জ্ঞান, ভক্তি ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সেই পূর্ণতার পথ দেখান একজন সত্যিকারের গুরু।
গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে ধর্মীয় নেতারা বলেন, কেবল আনুষ্ঠানিক পূজা নয়, গুরুর আদর্শ, শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ জীবনে ধারণ করাই এই দিনের মূল শিক্ষা। গুরুর নির্দেশিত সত্য, ন্যায় ও মানবকল্যাণের পথে চলাই একজন শিষ্যের প্রকৃত গুরুসেবা।
পবিত্র এই দিনে সকলের জীবনে জ্ঞান, শান্তি, ভক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটুক, গুরুজনদের আশীর্বাদে আলোকিত হোক প্রতিটি জীবন, এটাই গুরুপূর্ণিমার প্রার্থনা।