নিজস্ব প্রতিবেদক: সত্য সনাতন টিভি || অনলাইন সংস্করণ
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার ভানুয়াই চৌধুরী বাড়ির সামনে অবস্থিত একটি প্রাচীন সমাধি-মঠ সড়ক উন্নয়ন কাজের অংশ হিসেবে ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, মঠটির বয়স প্রায় ৫০০ বছর এবং এটি এলাকার অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে একটি ছিল।
ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মঠটি অপসারণের দৃশ্য দেখা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। ভিডিওটি দেখে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, বহু শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী একটি স্থাপনা এভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া স্থানীয় ঐতিহ্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সমাধি-মঠটি এলাকার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন সময়ে এলাকাবাসী এবং দর্শনার্থীরা স্থাপনাটি দেখতে আসতেন। তবে সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এটি ভেঙে ফেলা হয় বলে তাঁদের দাবি।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সচেতন মহলের মতে, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন; তবে উন্নয়নের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে বিকল্প নকশা বা সংরক্ষণ পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়, যাতে ইতিহাস ও উন্নয়ন উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে একের পর এক প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা হারিয়ে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর জানতে পারবে না এই অঞ্চলের শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা। তাঁদের মতে, একটি স্থাপনা শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এটি একটি জনপদের অতীত, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার নীরব সাক্ষী।
ঐতিহ্য সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা বহু প্রাচীন মঠ, মন্দির, আশ্রম ও ধর্মীয় স্থাপনা আজ সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্তির পথে। কিছু স্থাপনা প্রত্নতাত্ত্বিক বা সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষিত হলেও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অযত্ন, অবহেলা, প্রাকৃতিক ক্ষয় কিংবা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের মতে, এসব স্থাপনা সংরক্ষণ করা গেলে দেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হতো।
ইতিহাসবিদদের মতে, শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনাগুলো কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়; এগুলো একটি দেশের সামগ্রিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এসব স্থাপনার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় নথিভুক্তকরণ এবং সম্ভব হলে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, মঠটি ভেঙে ফেলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে, মঠটির প্রকৃত বয়স, প্রত্নতাত্ত্বিক মর্যাদা এবং ভাঙার আগে সংরক্ষণের বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা হয়েছিল কি না সেসব বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য প্রাচীন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে উন্নয়নের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্য ও ইতিহাসও সমানভাবে রক্ষা পায়।