নিজস্ব প্রতিবেদক : সত্য সনাতন টিভি || অনলাইন সংস্করণ
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার গড়কাটি গ্রাম ও বাদাঘাট বাজারে একটি ফেসবুক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা স্থানীয়ভাবে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অভিযুক্ত যুবককে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার পরও কেন এ ধরনের সহিংসতা ঘটল সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও এলাকাবাসী।
ঘটনার সূত্রপাত ২৩ জুন। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, ২১ বছর বয়সী সুদীপ্ত রায় ফেসবুকে একটি পোস্টে মন্তব্য করেন, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে এমন অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের উদ্দেশ্যে সুদীপ্তর বাবা নিখিল রায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তাদের পরামর্শে তিনি ছেলেকে নিয়ে বাদাঘাট বাজারে যান। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর মুহূর্তেই উত্তেজিত জনতা জড়ো হয়ে তাদের ঘিরে ফেলে।
নিখিল রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তিনি ছেলেকে নিয়ে একটি দোকানে আশ্রয় নেন। দোকান মালিক মুক্তার হোসেন দোকানের শাটার নামিয়ে সুদীপ্তকে জনতার হাত থেকে রক্ষা করেন। পরে খবর পেয়ে তাহিরপুর থানা পুলিশ এসে দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে সুদীপ্তকে নিরাপদে থানায় নিয়ে যায়।
দোকান মালিক মুক্তার হোসেন বলেন, আশ্রয় নেওয়ার পর বহু মানুষ সুদীপ্তকে তুলে নিয়ে যেতে চাইলেও তিনি তা হতে দেননি। বাজার কমিটির সদস্যদের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত পুলিশ নিরাপদে তাকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
কিন্তু সুদীপ্তকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শত শত মানুষের একটি মিছিল বাদাঘাট বাজার থেকে গড়কাটি গ্রামে গিয়ে কয়েক দফায় হামলা চালায়। হামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং একাধিক মন্দির ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে।
ক্ষতিগ্রস্ত কেতকী রায় বলেন, তাদের ঘরের আসবাবপত্র, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়েছে। বাড়ির দেয়াল, টিনের বেড়া, পানির টিউবওয়েল, পানির মোটর এবং দোকানপাটও ভাঙচুর করা হয়েছে।
গড়কাটি উত্তরপাড়া সার্বজনীন মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুব্রত রায় সুমনের ভাষ্য অনুযায়ী, সুদীপ্ত নিজের ভুল বুঝে স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে উত্তেজিত জনতার একটি অংশ ফেসবুক লাইভ ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে আরও মানুষ জড়ো করে হামলা চালায়। এতে কালীমন্দির, দুর্গামন্দির, নাটমন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গণেশ তালুকদার জানান, এলাকায় এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা আগে ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্যেই বসবাস করে আসছেন। তিনি হামলার ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।
বাদাঘাট বাজার বণিক সমিতির সভাপতি নজরুল সিকদারও বলেন, বহু বছর ধরে এলাকায় দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত হামলা ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেক অপরিচিত লোকও ছিল, যারা আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামলার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায় পুরো একটি সম্প্রদায়ের ওপর বর্তায় না। ধর্মের নামে মন্দির কিংবা মসজিদে হামলার কোনো স্থান নেই। তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তাহিরপুর উপজেলা সভাপতি মো. মুখলেছুর রহমান বলেন, অভিযুক্ত যুবককে জনতার সামনে না এনে গোপনে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। তিনি বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরকে অনাকাঙ্ক্ষিত, অনুচিত ও লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন।
ঘটনায় সুদীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছে পুলিশ এবং তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তবে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত পৃথক কোনো মামলা দায়ের বা কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন।
সুদীপ্তর বাবা-মা জানান, তাদের ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। গ্রেপ্তারের কারণে সে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যেমন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তেমনি হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদেরও দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে বহু বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ পুনরুদ্ধারে প্রশাসন ও স্থানীয় নেতৃত্বকে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।