নিজস্ব প্রতিবেদন : সত্য সনাতন টিভি || অনলাইন সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শ্মশান ও মন্দিরের উন্নয়নকাজ বন্ধের বিষয়ে চলমান আইনি বিরোধে শ্মশান কর্তৃপক্ষের পক্ষে রায় দিয়েছেন আদালত। রোববার (তারিখ) নারায়ণগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতের বিচারক শারমিন আক্তার পিংকি পারটেক্স গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আম্বার পেপার মিলসের দায়ের করা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন খারিজ করে দেন।
এ রায়ের ফলে শ্মশানের আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিবাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম সাখাওয়াত হোসেন খান।
রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্মশান ও মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্যসহ স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়। পরে মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং সম্প্রদায়ের নেতারা সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে গিয়ে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও মিষ্টি প্রদান করেন। আদালতে শ্মশানের পক্ষে সক্রিয় আইনি ভূমিকা রাখার জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে শ্মশান ও মন্দির রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
রায়ের বিষয়ে অ্যাডভোকেট এম সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, “আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে শ্মশানের উন্নয়নকাজ অব্যাহত রাখতে আর কোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই। জনস্বার্থ এবং স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির বিষয়টি আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। এ রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
অন্যদিকে, মামলার বাদীপক্ষ আম্বার পেপার মিলসের আইনজীবী মজিদ খন্দকার জানান, তাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে আদালতের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন এবং আইনগত লড়াই চালিয়ে যাবেন।
ঐতিহাসিক শ্মশান ও জমি নিয়ে বিরোধ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের আজিবপুর এলাকায় অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো শ্মশান ও মন্দিরটি ১৭৯৩ সাল থেকে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, এরশাদ সরকারের আমলে মাত্র ১ টাকায় প্রায় ৭০০ শতাংশ (প্রায় ৭ একর) জমি স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল পারটেক্স গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আম্বার পেপার মিলসকে। বর্তমানে ওই এলাকার প্রতি শতাংশ জমির বাজারমূল্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা হওয়ায় সম্পত্তিটির মূল্য শতকোটি টাকারও বেশি বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে শ্মশান ও মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত জমির ওপর শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি মালিকানা দাবি করে আসছে, যা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত।
আধুনিকায়ন প্রকল্প ও আইনি জটিলতা
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে শ্মশানটির আধুনিকায়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় অত্যাধুনিক দাহ চুল্লি, গোসলখানা, অফিস ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে একাধিক পাইলিং পিলার স্থাপন করা হলেও পরবর্তীতে আম্বার পেপার মিলস উচ্চ আদালত থেকে স্থিতাবস্থা আদেশ নিয়ে আসায় প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
শ্মশান পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, ১৯৮৯ সালে পারটেক্স গ্রুপের লিজ গ্রহণের সময় শ্মশানের ৩১ শতাংশ জমির তথ্য গোপন করা হয়েছিল। তাদের দাবি, বর্তমানে শতকোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি মাত্র ১ টাকায় স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়টি যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে।
সর্বশেষ আদালতের রায়ের ফলে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে শ্মশানের উন্নয়নকাজ পুনরায় শুরু হওয়ার পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।