নিজস্ব প্রতিবেদন : জয় দাশ || চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কথা উঠলেই সর্বপ্রথম স্মরণ করা হয় মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কিংবা কল্পনা দত্তের নাম। কিন্তু এই ইতিহাসের অন্তরালে এমন অনেক বিপ্লবী রয়েছেন, যাদের অবদান ছিল অসামান্য, অথচ সময়ের প্রবাহে তাঁদের নাম অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। তেমনই এক বিস্মৃত বিপ্লবী অনুরূপচন্দ্র সেন।
১৮৯৮ সালে চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ার এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অনুরূপচন্দ্র সেন। তাঁর পিতা ছিলেন কমলকুমার সেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, অধ্যবসায়ী এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। শিক্ষাজীবনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে তিনি ১৯১৮ সালে চট্টগ্রাম মাদ্রাসা থেকে আই.এ. পরীক্ষায় ৭৫ শতাংশ নম্বর অর্জন করেন। পরে ১৯২০ সালে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। এম.এ. শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তিনি সরাসরি বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।
অনুরূপচন্দ্র সেন ও বিপ্লবী নেতা সূর্য সেন ছিলেন সমবয়সী এবং একই এলাকার বাসিন্দা। নোয়াপাড়ার এই দুই তরুণের বন্ধুত্ব পরবর্তীকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অঙ্গীকার তাদের একই আদর্শে যুক্ত করেছিল।
শিক্ষক হিসেবে অনুরূপচন্দ্র সেন ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বুড়ুল হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার সময় তিনি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; ছাত্রদের মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদাবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা হাতে লেখা জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘সাধনা’ প্রকাশ করত। পাশাপাশি তিনি যুবসমাজকে সংগঠিত করতে অস্ত্রচর্চা, লাঠিখেলা এবং দেহচর্চার গোপন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গড়ে তুলেছিলেন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সাংগঠনিক ইতিহাসে অনুরূপচন্দ্র সেনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৮ সালে যে পাঁচ সদস্যের কেন্দ্রীয় বিপ্লবী দল গঠিত হয়েছিল, তিনি ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। এই দলের অন্য সদস্যরা ছিলেন সূর্য সেন, নগেন সেন (জুলু), অম্বিকা চক্রবর্তী এবং চারু বিকাশ দত্ত। গবেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বিপ্লবীদের গোপন সাংগঠনিক সংবিধান প্রণয়নের কাজেও অনুরূপচন্দ্র সেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে দলের নির্দেশে ১৯২২ সালে বুড়ুল হাইস্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি একদিকে সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন, অন্যদিকে বিপ্লবীদের জন্য একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক ঘাঁটি গড়ে তোলেন। তাঁর এই কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছিলেন প্রিয় ছাত্র প্রভাস রায়, মুরারীশরণ চক্রবর্তীসহ আরও অনেক তরুণ কর্মী।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার নজর দ্রুতই তাঁর ওপর পড়ে। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দক্ষিণেশ্বর বোমা মামলায় ১৯২৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাঁকে বুড়ুল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে ময়নাগুড়িতে অন্তরীণ রাখা হয়। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে কাশীতে স্থানান্তর করা হয়।
দীর্ঘ সংগ্রাম ও বন্দিজীবনের অবসান ঘটে ১৯২৮ সালের ৪ এপ্রিল। কাশীর শ্রীরামকৃষ্ণ অনাথ আশ্রমে অন্তরীণ অবস্থায় মাত্র ৩০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন অনুরূপচন্দ্র সেন। অকালপ্রয়াণে থেমে যায় এক সম্ভাবনাময় বিপ্লবী জীবনের পথচলা।
আজও পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বুড়ুল হাইস্কুল এবং স্থানীয় জনপদে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এই বিপ্লবী শিক্ষককে। তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে তাঁর মূর্তি এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাঁর নামাঙ্কিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অনুরূপচন্দ্র সেন হয়তো আলোচিত নামগুলোর কাতারে নেই। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে যেসব বিপ্লবী নীরবে আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ইতিহাসের পাতায় তাঁর অবদান নতুন করে মূল্যায়ন ও স্মরণ করা সময়ের দাবি।