নিজস্ব প্রতিবেদন: সত্য সনাতন টিভি || অনলাইন সংস্করণ
বরিশালের শান্ত গ্রাম মাহিলারা। সবুজ প্রকৃতি আর গ্রামীণ জনপদের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো এক ঐতিহাসিক স্থাপনা—মাহিলারা সরকার মঠ। সময়ের বহু ঝড়ঝাপটা, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করেও আজও টিকে আছে এই প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তি। ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, লোককথা ও স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় হিসেবে মঠটি দীর্ঘদিন ধরে গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
মাহিলারা সরকার মঠকে অনেকেই ‘বাংলার পিসার হেলানো টাওয়ার’ নামে অভিহিত করেন। কারণ, ইতালির বিখ্যাত লিনিং টাওয়ার অব পিসার মতোই এই মঠটিও সামান্য হেলে রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের এক জীবন্ত প্রতীক।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, নবাব আলীবর্দী খানের শাসনামলে, আনুমানিক ১৭৪০ থেকে ১৭৫৬ সালের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি রূপরাম দাস গুপ্ত এই মঠ নির্মাণ করেন। ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে নির্মিত এ স্থাপনাটি বাংলার শিখর-শৈলীর মন্দির স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
প্রায় ৯০ ফুট উঁচু মঠটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর হেলে থাকা কাঠামো। বিভিন্ন গবেষণা ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, মঠটি দক্ষিণ দিকে প্রায় ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি কোণে ঝুঁকে রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ অবস্থায় টিকে থাকায় এটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহলের শেষ নেই। দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এই অনন্য স্থাপত্যকীর্তি দেখতে ছুটে আসেন।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও মাহিলারা সরকার মঠ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অষ্টভুজাকার ভিত্তির ওপর নির্মিত এ মঠের উচ্চতা প্রায় ২৭ দশমিক ৪৩ মিটার। মঠের উঁচু শিখর, ধনুকাকৃতির কার্নিস, টেরাকোটার অলংকরণ এবং সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশা আঠারো শতকের শিল্পরুচি ও কারিগরি দক্ষতার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে। ইটের গাঁথুনির সঙ্গে স্টাকো প্লাস্টারের ব্যবহার স্থাপনাটিকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। নিম্ন কাঠামোর কোণাগুলোতে ক্ষুদ্র চূড়াবিশিষ্ট বুরুজ স্থাপন করা হয়েছে, যা বাংলার পঞ্চরত্ন ও নবরত্ন স্থাপত্যধারার প্রভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
তবে মাহিলারা সরকার মঠকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জনপ্রিয় লোককথা। জনশ্রুতি রয়েছে, মঠ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠাতা রূপরাম দাস গুপ্ত গর্বভরে বলেছিলেন, “মা, তোমার সব ঋণ শোধ করে দিলাম।” কথাটি উচ্চারণের কিছুক্ষণ পরই নাকি মঠটি হেলে যায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এর মধ্য দিয়ে যেন একটি গভীর সত্য প্রকাশিত হয়েছিল—মায়ের ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। যদিও এ ঘটনার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবুও লোককথাটি আজও এলাকার মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।
দীর্ঘ ইতিহাসের এই স্থাপনাটি নানা প্রতিকূলতারও সাক্ষী। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে মঠটি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। তবুও সব বাধা অতিক্রম করে এটি আজও টিকে আছে আপন মহিমায়। বর্তমানে এখানে দুর্গাপূজা, রথযাত্রা, নগরকীর্তনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ফলে এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখনও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আসেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক ক্ষয়, অবহেলা এবং পরিবেশগত নানা কারণে মঠটির কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাস গবেষকরা মনে করেন, দ্রুত কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে দেশের এই অমূল্য ঐতিহ্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলার ইতিহাস, স্থাপত্য ও লোকসংস্কৃতির এক অনন্য দলিল হিসেবে মাহিলারা সরকার মঠ আজও অতীতের গৌরবগাথা বহন করে চলেছে। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে হেলে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি শুধু একটি মন্দির নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্য ঐশ্বর্যের এক মূল্যবান স্মারক।