শীতের ঘন কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কুমারখালী এলাকার কালীমন্দির প্রাঙ্গণ ভরে উঠতে শুরু করে মানুষের পদচারণায়। চারদিকে মাটির চুলার ধোঁয়া, জ্বলে ওঠা আগুনের লেলিহান শিখা আর সদ্য তৈরি গরম চিতই পিঠার ঘ্রাণে সৃষ্টি হয় এক অন্যরকম আবহ। মন্দির চত্বরে সারিবদ্ধভাবে জ্বলতে থাকা ১০৮টি মাটির চুলা যেন শত বছরের ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় উপজেলার সদর ইউনিয়নের কুমারখালী বাজারসংলগ্ন দেবলাল চক্রবর্তীর বাড়ির কালীমন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী চিতই পিঠা উৎসব। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে উৎসব চলে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকাল পর্যন্ত। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও কালের পরিক্রমায় এটি এখন পরিণত হয়েছে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনমেলায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দির প্রাঙ্গণে সুসজ্জিতভাবে স্থাপন করা হয়েছে ১০৮টি মাটির চুলা। প্রতিটি চুলার ওপর রাখা হয়েছে মাটির সাজ ও সরা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নারীরা চালের গুঁড়া দিয়ে চিতই পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত। কেউ আগুন জ্বালাচ্ছেন, কেউ সরা থেকে পিঠা নামাচ্ছেন, আবার কেউ তৈরি করা পিঠা বড় পাত্রে জমা করছেন। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ।
সন্ধ্যা ঘনানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে। ভক্ত, পুণ্যার্থী, মানতকারী ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অনেকেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন চালের গুঁড়া, জ্বালানি কাঠ ও বাঁশ। কেউ এসেছেন মনোবাসনা পূরণের আশায়, কেউ আবার বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের টানে।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুরোহিত দেবলাল চক্রবর্তী মন্ত্রপাঠ শুরু করলে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সূচনা হয়। পরে তিনি একে একে ১০৮টি চুলায় আগুন জ্বালিয়ে দিলে শুরু হয় চিতই পিঠা তৈরির মূল আয়োজন। তৈরি হওয়া পিঠা প্রথমে প্রতিমার ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। এরপর প্রসাদ হিসেবে উপস্থিত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বিশেষ করে মানত নিয়ে আসা পুণ্যার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এই পবিত্র প্রসাদ।
বরিশাল থেকে আসা পুণ্যার্থী সুমিত্রা রানী দাস জানান, ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে তিনি এ উৎসবে আসতেন। সংসারের প্রয়োজনে দূরে চলে গেলেও প্রতি বছর এই আয়োজনের সময় তাঁর মন পড়ে থাকে নাজিরপুরে। শৈশবের স্মৃতি আর আবেগের টানেই তিনি আবারও এসেছেন উৎসবে অংশ নিতে।
গত বছর সন্তানের আশায় এখানে মানত করেছিলেন শ্যামা পাল। এবার তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে এসেছেন চিতই পিঠা বানাতে। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় তিনি এখানে এসে মানত করেছিলেন। পরে সন্তান লাভের পর কৃতজ্ঞতা জানাতেই আবার এসেছেন এই আয়োজনে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাহুল বিশ্বাস বলেন, একসময় এটি ছিল মূলত মানত ও ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুষ্ঠান। কিন্তু বর্তমানে এটি এলাকার সবচেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে এসে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
মনোবাসনা পূরণের আশায় উৎসবে অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুসলিম গৃহবধূ বলেন, মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার এই জায়গায় ধর্মের কোনো বিভেদ নেই। সন্তান কামনায় তিনিও এসেছেন এই আয়োজনে অংশ নিতে।
১৯৮৬ সাল থেকে বংশপরম্পরায় মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করে আসছেন দেবলাল চক্রবর্তী। তিনি জানান, প্রায় ৯২ বছর আগে তাঁর পূর্বপুরুষ হরষিত আনন্দ চক্রবর্তী মাঘের অমাবস্যা উপলক্ষে এখানে মেলার আয়োজন শুরু করেন। সে সময় অমাবস্যার দিনে শুকনা খাবার খাওয়ার একটি রীতি ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় চিতই পিঠা তৈরি করে প্রসাদ বিতরণের প্রচলন শুরু হয়। মানুষ বিশ্বাস করতেন, এই প্রসাদ গ্রহণ করলে মনোবাসনা পূরণ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে এটি বৃহৎ উৎসবে রূপ নেয়।
শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আয়োজন এখন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি নাজিরপুরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির প্রতীক। শীতের রাতভর ১০৮টি চুলায় পিঠা তৈরির এই ব্যতিক্রমী উৎসব প্রতি বছরই টেনে আনে হাজারো মানুষকে। বিশ্বাস, ঐতিহ্য আর মানুষের মিলনেই আজও টিকে আছে নাজিরপুরের এই অনন্য চিতই পিঠা উৎসব।