স্নানযাত্রার পবিত্র তিথিতে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মা কালীমন্দিরের ১৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৮৫৫ সালের ৩১ মে, বাংলা ১২৬২ সনের ১৮ জ্যৈষ্ঠ, বৃহস্পতিবার পুণ্য স্নানযাত্রার দিনে লোকমাতা রানী রাসমণি দেবী এই ঐতিহাসিক মন্দিরে মা ভবতারিণীর প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন করেন। সেই থেকে প্রতি বছর এই তিথি মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
জনশ্রুতি রয়েছে, কাশীধামে তীর্থযাত্রার প্রস্তুতিকালে রানী রাসমণি দেবী স্বপ্নে দেবী মায়ের নির্দেশ লাভ করেন। সেই নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি কাশীযাত্রা স্থগিত করে গঙ্গাতীরে একটি মহৎ দেবালয় নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৮৪৭ সালে গঙ্গার পূর্ব তীরে দক্ষিণেশ্বর গ্রামে প্রায় ষাট বিঘা জমি ক্রয় করা হয় এবং শুরু হয় মন্দির নির্মাণের কাজ।
দীর্ঘ আট বছরের নিরলস প্রচেষ্টা ও বিপুল ব্যয়ের মাধ্যমে নির্মিত হয় এই নয় চূড়াবিশিষ্ট মহিমান্বিত মন্দির। তৎকালীন সময়ে প্রায় নয় লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই দেবালয় স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। একশ ফুটেরও অধিক উচ্চতার এই মন্দির বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক গৌরবময় স্মারক।
মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় সমাজের একাংশের নানা আপত্তি, বাধা ও কুসংস্কারের সম্মুখীন হতে হয়েছিল রানী রাসমণিকে। কিন্তু সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে শুভক্ষণে মহাসমারোহে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় মা ভবতারিণীর বিগ্রহ। মন্দিরের গর্ভগৃহে রূপার সহস্রদল পদ্মের উপর অধিষ্ঠিত রয়েছেন দেবী। একখণ্ড প্রস্তরখণ্ড খোদাই করে নির্মিত এই বিগ্রহ শিল্পসৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক মহিমার এক অপূর্ব নিদর্শন। বর্ধমান জেলার দাঁইহাটের খ্যাতিমান শিল্পী নবীন ভাস্কর এই বিগ্রহ নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়।
দক্ষিণমুখী এই মন্দির কেবল শাক্তধর্মের উপাসনাকেন্দ্র নয়, এটি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমন্বয়েরও এক উজ্জ্বল প্রতীক। শাক্ত, বৈষ্ণব ও শৈব ভাবধারার মধ্যে ঐক্য ও সৌহার্দ্যের যে বার্তা এই মন্দির বহন করে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয়।
প্রতিদিন নিয়মিত পূজা, অর্চনা ও নৈবেদ্য নিবেদনের ব্যবস্থা থাকলেও একটি বিশেষ প্রথা যুগ যুগ ধরে অনুসৃত হয়ে আসছে। স্নানযাত্রার তিথি তথা মন্দির প্রতিষ্ঠা দিবসে বছরে মাত্র একবার দেবীর উদ্দেশে লুচি নিবেদন করা হয়। এই উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ পূজা, আরতি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং ভক্তসমাগম।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে ভোর থেকেই ভক্তদের ঢল নামে। মা ভবতারিণীর চরণে প্রার্থনা নিবেদন করে দেশ-বিদেশ থেকে আগত অসংখ্য পুণ্যার্থী। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী উদ্যাপিত হয় এই ঐতিহাসিক দিবস।
প্রতিষ্ঠার ১৭১ বছর অতিক্রম করেও দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মা কালীমন্দির আজও কোটি কোটি মানুষের ভক্তি, বিশ্বাস ও আস্থার কেন্দ্রবিন্দু। বাংলার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে এই তীর্থক্ষেত্র যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত থাকবে।