সনাতন ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র উৎসব ‘অক্ষয় তৃতীয়া’ সমাগত। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের এই তৃতীয় তিথিটি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমৃদ্ধি, দান এবং নতুন সূচনার এক বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ‘অক্ষয়’ শব্দের অর্থ যা কখনো ক্ষয় হয় না এই বিশ্বাস থেকেই প্রতি বছর অগণিত মানুষ এই দিনে শুভ কাজের সূচনা করেন।
অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য ভারতীয় শাস্ত্র ও পুরাণের পাতায় অত্যন্ত উজ্জ্বল। হিন্দু ধর্মতত্ত্ব অনুসারে, এই দিনটি ‘স্বয়ংসিদ্ধ মুহূর্ত’ হিসেবে পরিচিত, যার অর্থ এদিন কোনো শুভ কাজের জন্য আলাদা করে পঞ্জিকা দেখার প্রয়োজন হয় না। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
এই তিথিতেই ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের জন্ম হয়েছিল।
রাজা ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী গঙ্গা এই দিনেই স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেন।
মহর্ষি বেদব্যাস এবং গণেশ এই পবিত্র দিনেই মহাকাব্য মহাভারত রচনা শুরু করেন।
মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, বনবাসে থাকাকালীন পাণ্ডবরা এই দিনে শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে ‘অক্ষয় পাত্র’ লাভ করেন, যা থেকে অফুরন্ত খাদ্যের সংস্থান হতো।
ব্যবসায়িক হালখাতা ও লক্ষ্মী-গণেশ পূজা:
বাঙালি ব্যবসায়িক সংস্কৃতিতে অক্ষয় তৃতীয়া এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এদিন ব্যবসায়ীরা নতুন আর্থিক বছরের হিসাব শুরু করেন, যাকে লোকজ ভাষায় ‘হালখাতা’ বলা হয়। দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লক্ষ্মী ও গণেশের বিশেষ পূজা অর্চনা করা হয় এবং ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। মূলত সারা বছরের ব্যবসার সমৃদ্ধি কামনাই এই আচারের মূল উদ্দেশ্য।
অক্ষয় তৃতীয়ায় সোনা কেনা এখন একটি আধুনিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, এদিন সোনা বা রূপার অলঙ্কার কিনলে ঘরে চিরস্থায়ী সুখ ও ঐশ্বর্য বিরাজ করে। জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এই দিনে বিশেষ ছাড় ও অফারের আয়োজন করে, ফলে বাজারজুড়ে এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়।
কেবল ভোগ বা বিলাসিতা নয়, অক্ষয় তৃতীয়ার একটি বড় দিক হলো ত্যাগ ও সেবা। এদিন দরিদ্রদের মাঝে অন্ন, জল, বস্ত্র এবং ছাতা দান করাকে পরম পুণ্যকর্ম বলে মনে করা হয়। শ্রীধাম মায়াপুর, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে এদিন বিশেষ মহোৎসব ও চন্দন যাত্রার আয়োজন করা হয়। পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার রথ নির্মাণের কাজও প্রথা মেনে এই অক্ষয় তৃতীয়া থেকেই শুরু হয়।