সনাতন ধর্মের শাশ্বত বাণী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় আলোকিত করার লক্ষ্য নিয়ে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার পশ্চিম ছাগলনাইয়া শীলপাড়ায় এক মহতী শ্রীগীতা দান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ০৩ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার, ‘জয় শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা ক্ষেত্র মন্দির (গ্রুপ)’-এর উদ্যোগে স্থানীয় শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ সেবাশ্রম গীতা শিক্ষা স্কুলের ১২০ জন শিক্ষার্থীর মাঝে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়।
গ্রামীণ পরিবেশে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি ছিল ভক্তি, আনন্দ ও উৎসাহে পরিপূর্ণ। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও পবিত্র শ্লোক পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরে গীতা শিক্ষা স্কুলের শিক্ষার্থীরা নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে অতিথিদের বরণ করে নেয়, যা উপস্থিত সবার মাঝে আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাঝে মোট ১২০টি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বিতরণ করা হয়। প্রতিটি গীতার সঙ্গে শালু কাপড় ও প্রতীকী দক্ষিণা প্রদান করা হয়। এছাড়াও শিক্ষাগুরুর পাঠদান সহজতর করতে একটি বড় গীতা, একটি হোয়াইট বোর্ড, একটি মার্কার ও একটি ডাস্টার প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মাননা স্বরূপ সভাপতিকে উত্তরীয় এবং শিক্ষাগুরুকে নামাবলী পরিয়ে বরণ করা হয়। একই সঙ্গে সভাপতি ও শিক্ষাগুরুকে পৃথকভাবে ক্রেস্ট প্রদান করা হয় এবং প্রতিষ্ঠান ও গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে একটি সম্মাননা স্মারক ও ব্যানার প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ‘জয় শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা ক্ষেত্র মন্দির (গ্রুপ)’ একটি অরাজনৈতিক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক সেবামূলক সংগঠন, যা দীর্ঘদিন ধরে সনাতন ধর্মের প্রচার-প্রসার এবং নৈতিক শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য দেশের ৬৪টি জেলার প্রতিটি গীতা স্কুলে গীতা দান করা এবং যেখানে গীতা স্কুল নেই, সেখানে নতুন গীতা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। ইতোমধ্যে সংগঠনটি দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিকবার গীতা দান ও শিক্ষা কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে এবং ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
গীতা শিক্ষা স্কুলের সভাপতি বাসুদেব শীল তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, এই উদ্যোগ শুধু একটি দান কর্মসূচি নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি আয়োজক সংগঠনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা বিষ্ণু সূত্রধর তার বক্তব্যে বলেন, সমাজে অনেকের আর্থিক সামর্থ্য থাকলেও সময় ও উদ্যোগের অভাবে ধর্মীয় শিক্ষায় অবদান রাখা হয় না। কিন্তু এই সংগঠন সীমিত সামর্থ্য নিয়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে গীতা দান কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তিনি অভিভাবকদের প্রতি সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
সাংগঠনিক সম্পাদক জয় চন্দ্র দাশ বলেন, তাদের সংগঠন কেবল একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি একটি নিঃস্বার্থ সেবামূলক পরিবার। তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষ যেন গীতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও নৈতিক জীবন গড়ে তুলতে পারে—এই লক্ষ্য নিয়েই সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে।
সহ-সভাপতি দ্বীপক কুমার দাস তার বক্তব্যে বলেন, মানুষ গড়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো নৈতিক শিক্ষা। তাই সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়মিত গীতা শিক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সমাপনী বক্তব্যে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অনুপম দে অর্জুন বলেন, “এই পৃথিবীতে জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছু নেই। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা শুধু উচ্চশিক্ষিত নয়, একজন সৎ ও মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠুক। সেই লক্ষ্যেই আমাদের এই সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”
উক্ত গীতা দান অনুষ্ঠানে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অনুপম দে অর্জুনের নেতৃত্বে প্রধান উপদেষ্টা বিষ্ণু সূত্রধর, যুগ্ম উপদেষ্টা শীতল কান্তি শীল, রবি বৈদ্য, চন্দন রায় ও পরিমল চন্দ্র রায়সহ উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সহ-সভাপতি দ্বীপক কুমার দাস, সাধারণ সম্পাদক রুপক লাল ধর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শুভ্র মালাকার, সাংগঠনিক সম্পাদক জয় চন্দ্র দাশ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক তরুন কৃষ্ণ দাশ এবং প্রচার সম্পাদক দীপ্ত পালসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্যরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
এদিকে সনাতনী লক্ষ্মী ভান্ডারের সদস্য হিসেবে রঞ্জন কুমার দাস, রিপন চন্দ্র দাস, অমৃত কুমার, পবিত্র রায় ও লাভলী বৈদ্যসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত থেকে দান কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রজেন দাস, সূর্য্য কুমার, বিধান চন্দ্র দাস, পলাশ চন্দ্র দাস, উত্তম কুমার, মোহন কুমার ও বিকাশ চন্দ্র দাসসহ স্থানীয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ।
অন্যদিকে আয়োজিত গীতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ সেবাশ্রম গীতা শিক্ষা স্কুলের সভাপতি বাসুদেব শীল, সাধারণ সম্পাদক মদন লাল দাস, কোষাধ্যক্ষ বিধান শর্ম্মা এবং সর্বাত্মক সহযোগী সুকান্ত শীল। এছাড়াও স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানটি এক প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষার্থীদের মাঝে গীতা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয় এবং সকলের মাঝে প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। আয়োজকরা জানান, সনাতন ধর্মের মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক সেবার আলো সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে তাদের এই সেবামূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।