চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অরণ্যের গভীরে অবস্থিত প্রাচীন তীর্থস্থান কুমিরা কুমারীকুণ্ড আজ অবহেলা ও অযত্নে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। বহু প্রাচীন এই স্থানটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হলেও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ঐতিহাসিক মন্দিরটির অবশিষ্টাংশ।
সত্য সনাতন টিভি'র প্রতিনিধি স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানতে পারে, সীতাকুণ্ড উপজেলার বড় কুমিরা এলাকায় কুমিরা খালের পাশ দিয়ে দুর্গম ঝিরিপথ ধরে অরণ্যের ভেতরে অবস্থিত এই কুণ্ড। তন্ত্র বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থে এটিকে কন্যাশ্রম শক্তিপীঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে অনেক ভক্তের কাছে এটি বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, রাজা দক্ষের যজ্ঞে অপমানিত হয়ে দেবী সতী যোগবলে আত্মাহুতি দেন। পরে শোকাহত মহাদেব শিব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করলে বিশ্ব ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করেন। দেবীর সেই দেহখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়ে শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
তন্ত্রগ্রন্থ পীঠনির্ণয়তন্ত্রে উল্লেখ রয়েছে,“কন্যাশ্রমে চ পৃষ্ঠং মে নিমিষো ভৈরবস্থথা সর্বানী দেবতা তত্র।”
অর্থাৎ কন্যাশ্রম নামক স্থানে দেবী সতীর পৃষ্ঠদেশ পতিত হয়েছিল। এখানে দেবীর নাম সর্বানী এবং ভৈরবের নাম নিমিষ। সত্য সনাতন টিভি
কন্যাশ্রম শক্তিপীঠের অবস্থান নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারীকে এই পীঠস্থান মনে করেন। আবার কারও মতে উত্তর ভারতের প্রাচীন কন্যাকুব্জ (বর্তমান কানৌজ) হতে পারে এই স্থান। তবে বহু গবেষক ও পণ্ডিতের মতে, বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডের কুমারীকুণ্ডই প্রকৃত কন্যাশ্রম শক্তিপীঠ।
শক্তিপীঠ গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সরকারসহ কয়েকজন গবেষক উল্লেখ করেছেন, চন্দ্রনাথ মন্দিরের আশপাশের পঞ্চক্রোশ এলাকার মধ্যেই কুমারীকুণ্ড শক্তিপীঠের অবস্থান। বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশও তাঁর ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’ গ্রন্থে এই পীঠস্থানের উল্লেখ করেছেন।
সত্য সনাতন টিভি | আমরা সত্যের সৈনিক
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বছর আগে এখানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠিত ছিল। বর্তমানে মন্দিরটির অস্তিত্ব নেই, তবে ভগ্ন লাল ইট ও ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায়। দুর্গম পাহাড়ি ঝিরিপথ অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছাতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কঠিন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ জানান, প্রায় দুই দশক আগে গুপ্তধনের আশায় কিছু মানুষ সেখানে খননকাজ চালালে মন্দিরের অবশিষ্টাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময় খননের স্থানে অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছিল বলেও লোকমুখে প্রচলিত আছে।
আরও জানা যায়, স্বাধীনতার পর সেখানে এক সময় একজন মোহন্ত ছিলেন। তবে পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর পর জায়গাটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
কুমারীকুণ্ড এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে গরম ও ঠান্ডা পানির উৎস একসঙ্গে থাকার কথাও স্থানীয়রা উল্লেখ করেন। পাহাড়ি ঝিরির ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় এক জায়গায় একই সঙ্গে উষ্ণ ও শীতল পানির স্পর্শ পাওয়া যায় বলে দাবি করেন অনেক ভক্ত ও দর্শনার্থী। সত্য সনাতন টিভি
স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা জানান, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় কুমারীকুণ্ডকে সংরক্ষণ করা জরুরি। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তাঁরা বলেন, “প্রাচীন এই শক্তিপীঠটি এখন অযত্নে পড়ে আছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে স্থানটি সংরক্ষণ করা সম্ভব।”
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কুমিরা এলাকায় এই কুণ্ডের অবস্থান। চট্টগ্রাম নিউমার্কেট থেকে বাসযোগে কুমিরা যাওয়া যায়। সেখান থেকে স্থানীয়দের সহায়তায় দুর্গম ঝিরিপথ পেরিয়ে কুমারীকুণ্ডে পৌঁছাতে হয়। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত এই কুমারীকুণ্ড সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।