বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। যাত্রা অভিনেতা, পরিচালক, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী মিলন কান্তি দে আর নেই। শনিবার বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কলিশহরে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
মিলন কান্তি দের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গবেষক ও সংস্কৃতিজন আমিনুর রহমান সুলতান। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই গুণী শিল্পী। শনিবার সকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সৎকারের সময়সূচি পারিবারিকভাবে নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি। সত্য সনাতন টিভি
মিলন কান্তি দের প্রয়াণে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। যাত্রাশিল্পের সংস্কার ও আধুনিকীকরণে তাঁর অবদান স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন নাট্যজন, সংস্কৃতিকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা।
১৯৪৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ছনহরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মিলন কান্তি দে। ষাটের দশকে যাত্রাশিল্পে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৬ সালে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশের পর দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি একের পর এক যুগান্তকারী কাজ উপহার দেন। ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালাকে সময়োপযোগী করে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন অগ্রপথিক।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ১২০টিরও বেশি যাত্রা প্রযোজনা পরিচালনা করেন এবং ১৫০টির বেশি প্রযোজনায় অভিনয় করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দেশ অপেরা, যা যাত্রাশিল্পে নতুন ভাবনা ও নান্দনিকতার সংযোজন ঘটায়। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা প্রশিক্ষক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
যাত্রাশিল্পের সার্বিক উন্নয়নে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দীর্ঘদিন তিনি যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নাট্যাঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য ২০২২ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। আজীবন যাত্রাশিল্পে নিবেদনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে যাত্রা শিল্পী সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি।
২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমি যে এক যাত্রাওয়ালা’, যেখানে যাত্রাশিল্পে তাঁর দীর্ঘ পথচলার কথা উঠে আসে। একই বছর তাঁর নির্বাচিত রচনাসমূহ সংকলিত হয়ে ‘নির্বাচিত যাত্রাপালা’ গ্রন্থটি একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়।
এছাড়া ‘যাত্রা শিল্পের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নন্দিত নায়িকারা’ শীর্ষক আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে, যা নবান্ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা।
প্রয়াণের ঠিক আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আসন্ন বইটির প্রচ্ছদের ছবি প্রকাশ করে আবেগঘন বার্তায় মিলন কান্তি দে লিখেছিলেন,
“এটাই হতে পারে আমার শেষ বই। জীবনের শেষ মুহূর্ত কাটাচ্ছি। সবাই প্রার্থনা করবেন। ধন্যবাদ নবান্ন প্রকাশনীকে।”
শিল্পীর সেই শেষ লেখাটি এখন দেশের যাত্রাশিল্পপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর বেদনার প্রতিধ্বনি তুলছে।