ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে বিদ্যা, বুদ্ধি, বাক্য ও সৃজনশীলতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন মাতা সরস্বতী। অজ্ঞানতার অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের আলো যিনি মানবচিত্তে প্রতিষ্ঠা করেন, তিনিই সরস্বতী। তাই প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় সমাজে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার সঙ্গে তাঁর আরাধনা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
শাস্ত্র অনুযায়ী, দেবী সরস্বতী অখিল জগতের বাক্শক্তি, বুদ্ধি ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী।
বিদ্যার্থীদের কাছে তিনি মেধা, স্মৃতি ও সুবুদ্ধির দাত্রী সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে তিনি কবিতা ও সৃষ্টিশীলতার উৎস; সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি সুর, তাল ও রাগের অনুপ্রেরণা। অজ্ঞানরূপী তমসা থেকে মানুষকে সত্ত্বগুণময় জ্ঞানের পথে উত্তরণ করাই তাঁর প্রধান লীলা।
শাস্ত্রে বর্ণিত দেবী সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্রে তাঁর রূপ ও মাহাত্ম্য সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে
“যা কুন্দেন্দু তুষারহার ধবলা, যা শুভ্রাবস্ত্রাবৃতা
সা মাং পাতু সরস্বতী ভগবতী নিঃশেষ জাড্যাপহা।”
এই স্তোত্রে দেবীকে কুন্দফুল, চন্দ্র ও বরফের ন্যায় শুভ্রবর্ণা, শ্বেতবস্ত্র ও মুক্তাহারধারিণী, বীণাবাদিনী ও শ্বেতপদ্মাসনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। দেবগণ যাঁর সদা বন্দনা করেন, সেই দেবী যেন আমাদের মন থেকে অজ্ঞানতার জড়তা দূর করেন এই প্রার্থনাই এর মূল ভাব।
দেবী সরস্বতীর আবির্ভাব ও পূজা সম্পর্কিত বিবরণ বেদের বিভিন্ন ব্রাহ্মণ ও সংহিতাভাগে, শ্রীব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের প্রকৃতিখণ্ড, পদ্মপুরাণ ও স্কন্দপুরাণে পাওয়া যায়। এসব শাস্ত্রীয় সূত্রে সরস্বতী পূজার সূচনার একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনি বিবৃত হয়েছে।
পুরাণ মতে, জগৎপিতা শ্রীকৃষ্ণ জড় জগতে সরস্বতী পূজার প্রচলনের উদ্দেশ্যে জগতগুরু রূপে ব্রহ্মাকে এই পূজার বিধান শিক্ষা দেন। ব্রহ্মা শ্রীকৃষ্ণের নিকট থেকে এই পূজা-পদ্ধতি গ্রহণ করে জড় জগতে প্রথম সরস্বতী পূজার প্রচলন করেন। পরবর্তীকালে বিষ্ণু ও শিবও সরস্বতী পূজা করে দেব, মানব ও দানব সমাজে এর আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রিদেবের অনুকরণেই ধীরে ধীরে সর্বত্র সরস্বতী পূজার প্রসার ঘটে।
চিন্ময়ধামে মাঘ মাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে সর্বপ্রথম সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। সেই অনুসরণেই আজও মাঘ মাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
দেবী সরস্বতীর শুভ্র বসন শুদ্ধতা, নিষ্পাপ মন, শান্তি ও স্বচ্ছতার প্রতীক। তাঁর হস্তস্থিত বীণা প্রেম, সুর ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। তাঁর বাহন রাজহংস বিশেষ তাৎপর্য বহন করে রাজহংস জলমিশ্রিত দুধ থেকে শুধু দুধটুকুই গ্রহণ করতে পারে। এর মাধ্যমে দেবী আমাদের শিক্ষা দেন যে জ্ঞান ও অজ্ঞান, সত্য ও মিথ্যার ভিড়ের মধ্য থেকেও মানুষকে সঠিক পথ বেছে নিতে হবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে
“বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি,
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ।”
অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি সকলের মধ্যেই সমভাবে আত্মতত্ত্ব দর্শন করেন।
এই জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলনই সরস্বতী সাধনার চরম লক্ষ্য। যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে সকলেই একই জগতপিতার সন্তান, তখনই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্য, দূর হয় বিভেদ ও বিদ্বেষ, এবং বিশ্বে শান্তির আবির্ভাব ঘটে। তাই বিদ্যার দেবী মাতা সরস্বতীর নিকট আমাদের প্রার্থনা তিনি যেন আমাদের সেই জ্ঞান ও বিবেকের আলো দান করেন।