সম্প্রতি দৈনিক আমার দেশ প্রত্রিকা সহ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত “ধামরাইয়ে হিন্দু যুবকদের দ্বারা মুসলিম গৃহবধু ধর্ষণ” শিরোনামের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরে অনেকে ক্ষোভ ও উত্তেজনা প্রকাশ করেন। তবে এই দাবির বাস্তবতা যাচাই করতে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।
কী দাবি করা হয়েছিল?
প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ধামরাইয়ের রামরাবন এলাকায় এক মুসলিম দম্পতি বেড়াতে এসে একটি হিন্দু পরিবারের বাড়িতে রাতযাপনকালে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ওই গৃহবধু। অভিযোগে আরও বলা হয়, স্বামীকে বেঁধে রেখে রাতভর ধর্ষণ এবং স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ লুট করা হয়।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে কী পাওয়া গেল?
ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রতিবেশী, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ধর্ষণের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যাকে ভুক্তভোগীর স্বামী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে আব্দুর রাজ্জাক তিনি নিজেই জানিয়েছেন, তার স্ত্রীর ওপর কোনো যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে মুখ ঢাকা দু’জন থেকে চার-পাঁচজন দুর্বৃত্ত ঘরে ঢুকে তাকে মারধর করে এবং তার স্ত্রীসহ তাদের সঙ্গে থাকা টাকা, মোবাইল ফোন ও কিছু অলঙ্কার ছিনিয়ে নেয়। সত্য সনাতন টিভি
তিনি আরও জানান, দুর্বৃত্তরা চলে যাওয়ার পর তিনি তার স্ত্রীকে কিছুটা দূরে কান্নারত অবস্থায় পান। তবে শারীরিক নির্যাতনের কোনো কথা স্ত্রী তাকে জানাননি।
প্রতিবেশীদের বক্তব্য
ঘটনার সময় আশপাশের কয়েকজন প্রতিবেশী চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাদের কেউই ধর্ষণের কোনো আলামত দেখেননি বা এমন অভিযোগ শোনেননি। সবাই একবাক্যে জানিয়েছেন, এটি একটি লুটপাটের ঘটনা ছিল।
এক প্রতিবেশী গৃহবধু জানান, তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন ঘরের ভেতরে কেউ বাঁধা অবস্থায় নেই, কোনো রক্তক্ষরণ বা সহিংসতার চিহ্নও ছিল না। শুধু কান্নাকাটি আর ছিনতাইয়ের কথা বলা হচ্ছিল।
বাড়ির মালিক ও স্বজনদের বক্তব্য
যে বাড়িতে ঘটনাটি ঘটেছে বলে বলা হচ্ছে, সেই বাড়ির মালিক শান্তি মনি দাস জানান, ঘটনার রাতে তিনি বাড়িতে ছিলেন না। পরদিন তিনি জানতে পারেন, তার ঘরে অবস্থান করা অতিথিদের কাছ থেকে কিছু মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অতিথিদের আতিথেয়তা দেওয়া কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসও বলেন, তিনি ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারীকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন কোনো অসম্মান বা শারীরিক নির্যাতন হয়েছে কি না। তখন তিনি এমন কিছু ঘটেনি বলেই জানান।
পুলিশ কী বলছে?
ধামরাই থানার পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনুসন্ধানে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পুলিশ আরও জানায়, এ ঘটনায় কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি। অস্ত্রের মুখে আটকে রেখে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের কোনো সত্যতা মেলেনি।
অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। আব্দুর রাজ্জাকের প্রকৃত স্ত্রী জানান, তিনি ওইদিন ধামরাইয়ে যাননি এবং স্বামীর সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার বিষয়েও কিছু জানেন না। এতে প্রশ্ন উঠেছে ঘটনাস্থলে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী নাকি অন্য কেউ?
এই বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি, কারণ রাজ্জাক পরবর্তীতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম প্রতিবেদনটি স্থানীয় একটি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত হয় এবং পরে একাধিক পত্রিকায় প্রায় একই ভাষায় পুনঃপ্রকাশিত হয়। তবে কোথাও সরাসরি ভুক্তভোগীর বক্তব্য বা থানার নিশ্চিত তথ্য যুক্ত ছিল না।
যে ব্যক্তির মাধ্যমে সংবাদটি ছড়ায় বলে দাবি করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে পূর্বে একাধিক অপরাধমূলক অভিযোগ থাকার তথ্য পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান, প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির বক্তব্য এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত সব মিলিয়ে এটি একটি ছিনতাই ও মারধরের ঘটনা, কিন্তু ধর্ষণের অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অপর্যাপ্ত যাচাই ও একপাক্ষিক তথ্যের ভিত্তিতে এমন সংবেদনশীল ঘটনা প্রকাশ হলে তা সামাজিক বিভ্রান্তি ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এমনটাই মত সংশ্লিষ্টদের।