শীতের তীব্রতায় যখন নিস্তব্ধ সাগরপাড় কাঁপছে, তখন গভীর রাতে চট্টগ্রামের উপকূলীয় জেলেপল্লীতে দেখা মিলল এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগের। কোনো পূর্বঘোষণা, আনুষ্ঠানিকতা কিংবা মাইকের শব্দ ছাড়াই শীতার্ত জেলে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ালেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। নিজের হাতে একে একে অসহায় মানুষের গায়ে কম্বল তুলে দিয়ে তিনি যেন মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) গভীর রাতে জেলা প্রশাসক আকমল আলী ঘাট, রানী রাসমনির ঘাট ও উত্তর কাট্টলী এলাকার জেলেপল্লীগুলোতে গিয়ে শীতার্ত জেলে পরিবার, নারী ও শিশুদের মাঝে কম্বল বিতরণ করেন। শীত নিবারণের এই কার্যক্রমে উপকূলের দুর্গম এলাকায় বসবাসরত মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। সত্য সনাতন টিভি
রানী রাসমনির ঘাট জেলেপল্লীর বাসিন্দা বেবি দাস (৩৫) জানান, দীর্ঘদিন ধরে এমন কাউকে তাদের পাশে পাননি। তিনি বলেন, “গভীর রাতে যখন স্যার নিজ হাতে কম্বল পরিয়ে দিলেন, তখন শুধু শরীর নয় মনও উষ্ণ হয়ে উঠেছিল। আমাদের মতো দরিদ্র মানুষের পাশে এভাবে দাঁড়ানো সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
উত্তর কাট্টলী এলাকার জেলে সমীরণ দাস (৫১) বলেন, শহরের এত কাছাকাছি থেকেও তারা দীর্ঘদিন অবহেলিত। “জীবনে প্রথমবার কোনো জেলা প্রশাসককে আমাদের এলাকায় দেখলাম। রাত দেড়টার সময় এসে আমাদের খোঁজ নেওয়া আমাদের কাছে সম্মানের,” বলেন তিনি।
এ সময় জেলেপল্লীর বাসিন্দারা তাদের আবাসন সংকট ও সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জেলা প্রশাসক বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে শোনেন এবং শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তিনি অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। সত্য সনাতন টিভি
জেলেদের উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসক বলেন, “জীবনমান পরিবর্তনের জন্য সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। পুরোনো জীবনধারায় সীমাবদ্ধ থাকলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার জেলে সম্প্রদায়ের টেকসই উন্নয়নে সব ধরনের সহায়তা দেবে।”
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় ভাসমান ও অসহায় মানুষের মাঝেও কম্বল বিতরণ করেন। এ সময় নূর কায়াস নামে এক অসহায় নারী ও তার সন্তানদের শীতকষ্টের বিষয়টি নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয় এবং পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সার্বিকভাবে ওই রাতে তিনটি জেলেপল্লী ও আশপাশের এলাকায় মোট ৫০০টি কম্বল বিতরণ করা হয়। শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দীন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাইফুল্লাহ মজুমদারসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গভীর রাতে জেলা প্রশাসকের এই মানবিক উপস্থিতি উপকূলীয় জনপদের অসহায় মানুষের মাঝে শুধু শীতের কষ্ট লাঘবই নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার আলোও জ্বালিয়েছে বলেজানান স্থানীয়রা।