খুলনা বিভাগের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র সরকারি ব্রজলাল কলেজ, সংক্ষেপে বিএল কলেজ, বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। দৌলতপুরে ভৈরব নদীর তীরে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এই কলেজ শতাধিক বছর ধরে জ্ঞানচর্চা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিএল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষানুরাগী শ্রী ব্রজলাল চক্রবর্তী (শাস্ত্রী)। তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজের আদলে খুলনা অঞ্চলে একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁরই উদ্যোগে ১৯০২ সালের জুলাই মাসে দৌলতপুরে ২ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় “হিন্দু একাডেমী”, যা পরবর্তীতে ব্রজলাল কলেজে রূপ নেয়।
প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে দুটি টিনশেড ঘরে ১৯০২ সালের ২৭ জুলাই থেকে ক্লাস শুরু হয়। কলেজটি পরিচালনার জন্য একটি বোর্ড অব ট্রাস্টি গঠন করা হয়, যার সভাপতি ছিলেন স্বয়ং ব্রজলাল চক্রবর্তী। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি আবাসিক ছিল এবং চতুষ্পাঠী ও একাডেমী নামে দুটি শাখায় বিভক্ত ছিল। শিক্ষার্থীদের খাবার, পড়াশোনা ও আবাসনের ব্যয়ভার প্রতিষ্ঠান বহন করত। "সত্য সনাতন টিভি"
১৯১০-১১ শিক্ষাবর্ষে কলেজে প্রথম মুসলিম হোস্টেল স্থাপিত হয়, যেখানে আরবি ও ফারসি ভাষার পাঠদান করা হত। পরবর্তীতে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নির্দেশে কলেজে প্রথম মুসলিম শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক উন্নয়নে খুলনার ঘাটভোগের জমিদার ত্রৈলক্যনাথ চট্টোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯০৭ সালে কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। "সত্য সনাতন টিভি"
প্রতিষ্ঠাতা ব্রজলাল চক্রবর্তীর মৃত্যু (১৯৪৪) পর প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ব্রজলাল হিন্দু একাডেমী, যা পরে ব্রজলাল কলেজ (বিএল কলেজ) নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
১৯৬৭ সালের ১ জুলাই তারিখে বিএল কলেজকে সরকারি কলেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হিসেবে উন্নীত হয়। "সত্য সনাতন টিভি"
বর্তমানে বিএল কলেজে অনার্স পর্যায়ে ২১টি এবং মাস্টার্স পর্যায়ে ২০টি বিষয়ে পাঠদান করা হয়। অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স পরিচালিত প্রধান বিভাগসমূহ হলো, বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, মনোবিজ্ঞান, ভূগোল, পরিসংখ্যান, মার্কেটিং, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান ও গণিত। এছাড়া ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে মাস্টার্স কোর্সও চালু রয়েছে।
১৯৯৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান বন্ধ থাকলেও ২০১০ সালে পুনরায় এই স্তরে পাঠদান শুরু হয়।
কলেজটিতে মোট সাতটি হোস্টেল রয়েছে, যার মধ্যে দুটি মহিলা হোস্টেল। এছাড়া রয়েছে সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, যেখানে প্রায় ১,১৮,৩৫০টি বই সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিটি বিভাগে নিজস্ব সেমিনার লাইব্রেরিও রয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি এখানে সহ-শিক্ষা কার্যক্রমও গুরুত্ব সহকারে পরিচালিত হয় যেমন বিতর্ক, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সমাজসেবা কার্যক্রম। "সত্য সনাতন টিভি"
বর্তমানে বিএল কলেজে প্রায় ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং প্রায় ২০০ জন শিক্ষক শিক্ষাদানে নিয়োজিত আছেন। "সত্য সনাতন টিভি"
এক শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজলাল কলেজ খুলনা ও দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এই কলেজ অগণিত মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি করে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তিত্ব উপহার দিয়েছে। ব্রজলাল চক্রবর্তীর স্বপ্নের এই শিক্ষালয় আজও আলোকিত করছে জ্ঞানের প্রদীপ। "সত্য সনাতন টিভি"