নিজস্ব প্রতিবেদক :
আজ ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন। ঠিক এক বছর আগে, এই দিনেই লালদিঘি মাঠ পরিণত হয়েছিল লাখো সনাতন ধর্মাবলম্বীর সমাবেশস্থলে। বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের ব্যানারে আয়োজিত সেই মহাসমাবেশে সনাতনীরা ৮ দফা দাবি নিয়ে এক কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন “অধিকার না পেলে রাজপথ ছাড়বো না!”
মহাসমাবেশের সভাপতিত্ব করেন সনাতন জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ও পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ শ্রীপাদ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী, যিনি তাঁর প্রভাবশালী বক্তব্যে সমাবেশের মূল দিকনির্দেশনা দেন।
তিনি বলেন “আমাদের যত বেশি নির্যাতন করা হবে, আমরা তত বেশি ঐক্যবদ্ধ হবো। এই ঐক্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও কৃষ্টি-সংস্কৃতির ঐক্য। এই ঐক্য কোনোভাবে খণ্ডিত করা যাবে না।”
তিনি আরও বলেন “আমরা এই দেশের ভূমিপুত্র। যারা আমাদের উচ্ছেদ করতে চায়, তারা কোনো গণতান্ত্রিক শক্তির অংশ নয়। যদি এই উচ্ছেদ চলতে থাকে, বাংলাদেশ আফগানিস্তান বা সিরিয়ার পথে যাবে। আমরা সেই অন্ধকার চাই না।”

শুক্রবার বিকাল থেকেই চট্টগ্রাম নগরী, আশপাশের উপজেলা, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা থেকে মিছিল মিছিল জনতা এসে ভরে তোলে লালদিঘি মাঠ। বলা হয়ে থাকে চট্টগ্রামের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলও এত মানুষের উপস্থিতি ঘটাতে পারেনি লালদিঘির মাঠে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন মঠ ও মন্দিরের সাধু-সন্ত, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। "সত্য সনাতন টিভি"
মাঠজুড়ে একের পর এক স্লোগান “আমার মায়ের কান্না বৃথা যেতে দেব না!”“আমার দেশ সবার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ!”“আমার মন্দিরে হামলা কেন? জবাব চাই, দিতে হবে!” “রক্তে আগুন লেগেছে, সনাতনিরা জেগেছে!”
সমাবেশ থেকে ঘোষিত ৮ দফা দাবি ছিল :
1️⃣ সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন ও দোষীদের কঠোর শাস্তি।
2️⃣ ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন।
3️⃣ সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন।
4️⃣ সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন।
5️⃣ হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে উন্নীত করা, এবং বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ট্রাস্টগুলোকেও একই মর্যাদা দেওয়া।
6️⃣ দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন।
7️⃣ প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের জন্য উপাসনালয় ও প্রার্থনা কক্ষ নির্মাণ, সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড আধুনিকায়ন।
8️⃣ শারদীয় দুর্গাপূজায় ৫ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা।

সভায় বক্তব্য দেন শ্রী শ্রী কৈবল্যধামের মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ কালীপদ ভট্টাচার্য্য, শংকর মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ তপনান্দ গিরি মহারাজ, পটিয়া পাঁচরিয়া তপোবন আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ রবীশ্বরানন্দ পুরী মহারাজ, ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের অধ্যক্ষ লীলারাজ গৌর দাস ব্রহ্মচারী,বাঁশখালী ঋষিধামের মোহন্ত সচিদানন্দ পুরী মহারাজ,তপোবন আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ প্রাঞ্জলানন্দ পুরী মহারাজ প্রমুখ। "সত্য সনাতন টিভি"
বক্তব্যে তারা বলেন, “৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সারাদেশে মন্দিরে হামলা, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জোরপূর্বক পদত্যাগ এসব ঘটনার বিচার ও প্রতিকার চাই। সংখ্যালঘু নির্যাতন থামাতে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।”
সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় প্রতিটি জেলায় ধারাবাহিকভাবে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে এবং ৮ দফা দাবি পূরণ না হলে ঢাকায় কেন্দ্রীয় কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
সত্য সনাতন টিভি | আমরা সত্যের সৈনিক
এরপর গত ৩১ অক্টোবর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগ এনে চট্টগ্রামে একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেন বিএনপি নেতা ফিরোজ খান। মামলাকারীকে বিএনপি পরে বহিষ্কার করে। কোতোয়ালি থানায় করা মামলায় চিম্ময় দাসসহ ১৯ জনকে আসামি করা হয়। মামলার আসামিরা হলেন- ইসকনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও পুণ্ডরীক ধাম মন্দিরের অধ্যক্ষ চন্দন কুমার ধর প্রকাশ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী (৩৮), চট্টগ্রামের হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সমন্বয়ক অজয় দত্ত (৩৪), নগরীর প্রবর্তক ইসকন মন্দিরের অধ্যক্ষ লীলা রাজ দাশ ব্রহ্মচারী (৪৮), গোপাল দাশ টিপু (৩৮), ডা. কথক দাশ (৪০), প্রকৌশলী অমিত ধর (৩৮), রনি দাশ (৩৮), রাজীব দাশ (৩২), কৃষ্ণ কুমার দত্ত (৫২), জিকু চৌধুরী (৪০), নিউটন দে ববি (৩৮), তুষার চক্রবর্তী রাজীব (২৮), মিথুন দে (৩৫), রুপন ধর (৩৫), রিমন দত্ত (২৮), সুকান্ত দাশ (২৮), বিশ্বজিৎ গুপ্ত (৪২), রাজেশ চৌধুরী (২৮) এবং হৃদয় দাস (২৫)।
মামলা করাকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ। মিথ্যা এই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য দফায় দফায় আন্দোলন ও করে তারা।
তারপর পূর্ব ঘোষিত ৮ দফা দাবি নিয়ে গত ২৩শে নভেম্বর ২০২৪ ইংরেজি রংপুরে সনাতনীদের বিভাগীয় সমাবেশ যোগদান করেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এবং সফলভাবে সমাবেশ শেষ করেন।
সমাবেশ শেষ করে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ইংরেজি সোমবার বিকেলে রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।